হোক হলিউড কিংবা বিশ্বের অন্য যে কোনো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি- ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা ও বিচারব্যবস্থার জটিল বাস্তবতা নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বহু বছর ধরেই সমাজে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আদালত, প্রতিশোধ, ট্রমা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নির্মিত এসব সিনেমা শুধু বিনোদন দেয় না, বরং দর্শককে অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
এরকম একডজনের বেশী শক্তিশালী চলচ্চিত্রের নাম বলা যাবে, যেগুলো যৌন সহিংসতা ও বিচার নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনাকে নতুনভাবে প্রভাবিত করেছে। বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় নির্মিত কিংবা কাল্পনিক গল্পভিত্তিক এসব সিনেমা সমাজ, আইন এবং ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
১৯৮৮ সালের ‘দ্য অ্যাকিউজড’ চলচ্চিত্রে জোডি ফস্টার অভিনয় করেছিলেন এক নারী চরিত্রে, যিনি গণধর্ষণের শিকার হওয়ার পর আদালতে ন্যায়বিচারের লড়াই চালান। বাস্তব ‘চেরিল আরাউজো’ মামলার অনুপ্রেরণায় নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি ধর্ষণের পর সমাজ কীভাবে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করে, সেই নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা হয়। এই অভিনয়ের জন্য জোডি ফস্টার অস্কার জেতেন।
অন্যদিকে ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’ শুধু একটি কোর্টরুম ড্রামা নয়, বরং বর্ণবাদ ও মিথ্যা ধর্ষণ অভিযোগের ভয়াবহ সামাজিক প্রভাব তুলে ধরা এক ঐতিহাসিক সিনেমা। গ্রেগরি পেক অভিনীত অ্যাটিকাস ফিঞ্চ চরিত্রটি আজও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
আধুনিক সময়ে ‘প্রমিজিং ইয়ং ওমেন’ সিনেমাটি ধর্ষণ ও প্রতিশোধের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে নির্মিত। ক্যারি মুলিগান অভিনীত এই ছবিতে এক নারীর নীরব প্রতিরোধ ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভণ্ডামি উঠে আসে তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে।
একইভাবে দ্য নাইটেঙ্গল, ইরিভার্সিবল, হার্ড ক্যান্ডি, দ্য গার্ল উইথ দ্য ড্রাগন ট্যাটো কিংবা এলে- প্রতিটি চলচ্চিত্রই যৌন সহিংসতার পর ট্রমা, প্রতিশোধ ও নৈতিকতার জটিল প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। কিছু চলচ্চিত্র দর্শককে সহানুভূতিশীল করে তোলে, আবার কিছু ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বস্তিতে ফেলে।
প্রবন্ধটিতে শুধু নারী নয়, পুরুষ ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতাও গুরুত্ব পেয়েছে। মিস্টেরিয়াস স্কিন, স্লিপার্স, মেস্টিক রিভার ও ডেলিভারেন্স-এর মতো সিনেমাগুলো দেখিয়েছে, যৌন সহিংসতা কেবল নারীদের বাস্তবতা নয়; পুরুষদের ক্ষেত্রেও তা গভীর মানসিক ক্ষত তৈরি করে, যা প্রায়ই সামাজিক নীরবতার আড়ালে থেকে যায়।
বাস্তব ঘটনার ওপর নির্মিত স্পটলাইট, দ্য ইনভিসিবল ওয়ার, দ্য হান্টিং গ্রাউন্ড এবং ডেলিভার আস ফ্রম ইভিল-এর মতো চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারিগুলো প্রতিষ্ঠানগত গোপনীয়তা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারহীনতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। বিশেষ করে ক্যাথলিক চার্চ, সামরিক বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন সহিংসতার অভিযোগ কীভাবে চাপা দেওয়া হয়েছে, তা এসব চলচ্চিত্রে দারুণ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
শুধু পূর্ণদৈর্ঘ্য নয়, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেও এসেছে সমাজের এই সংবেদনশীল বিষয়টি। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ান স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিসেপেয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম’ এর কথা বলা যায়। এই সিনেমাটিতে এক স্কুল শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অপরাধে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন শাস্তি দেওয়া হয়, যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর। নির্মাতা ম্যাট রিচার্ডসের এই সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলে।
ধর্ষণ নিয়ে পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক, যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৮ সালে ধর্ষণের ঘটনায় মাত্র ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার হয়েছিল। আর শেষ পর্যন্ত কারাদণ্ড হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ ঘটনায়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে যৌন সহিংসতার শিকার হন। শিশুদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার।
ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা ও বিচারব্যবস্থার জটিল বাস্তবতা নিয়ে নির্মিত সিনেমাগুলো নিয়ে বছর চারেক আগের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ধর্ষণ ও বিচার নিয়ে নির্মিত এসব চলচ্চিত্র সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ এগুলো শুধু গল্প বলে না বরং নীরবতা ভাঙে, প্রশ্ন তোলে এবং মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে। আইন, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ন্যায়বিচারের কাঠামো নিয়ে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করাই এসব সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি। কিলরয়





