তারেক রহমান-আনোয়ার ইব্রাহিম: নিপীড়নের পথ পাড়ি দেওয়া দুই সরকারপ্রধান | চ্যানেল আই অনলাইন

তারেক রহমান-আনোয়ার ইব্রাহিম: নিপীড়নের পথ পাড়ি দেওয়া দুই সরকারপ্রধান | চ্যানেল আই অনলাইন

পুত্রজায়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সোমবার সকালে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে এটি ছিল দুই দেশের সরকারপ্রধানের আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি।

তবে দৃশ্যটির একটি রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় বেড়ে উঠলেও দুই নেতার জীবনপথে কিছু মিল দেখা যায়। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা, কারাবাস কিংবা নির্বাসনের অভিজ্ঞতা এবং নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে তারা সরকারপ্রধানের দায়িত্বে পৌঁছেছেন।

সোমবার (২২ জুন) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টায় পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে দুই নেতাকে একসঙ্গে দেখা যায়। এর আগে তারা একান্ত বৈঠক করেন। পরে প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে রোববার রাতে কুয়ালালামপুরে পৌঁছান তিনি।

স্থানীয় সময় রাত পৌনে নয়টায় কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী দেওয়া হয় গার্ড অব অনারও। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী জুলকিফলি হাসান।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে তিনি ছোটবেলা থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।

ছাত্রজীবনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ঘটনাপ্রবাহও কাছ থেকে দেখেছেন। পরে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। এসময় শারীরিকভাবে তাকে নির্যতন করা হয়। প্রায় ১৮ মাস কারাবন্দী থাকার পর মুক্তি পান। চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে গেলেও দীর্ঘ সময় দেশে ফিরতে পারেননি।

বিদেশে অবস্থান করেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনা করেন। প্রায় ১৭ বছর পর দেশে ফিরে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্ব দেন। ওই নির্বাচনে দলের বিজয়ের পর তিনি দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

আনোয়ার ইব্রাহিমের রাজনৈতিক জীবনও নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে তিনি একসময় দেশটির সম্ভাব্য উত্তরসূরি নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধের প্রেক্ষাপটে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সমকামিতার অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগ তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।

দুই দফায় প্রায় নয় বছর কারাগারে কাটানোর পরও তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং বিরোধী রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।

পরে সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর ২০২২ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হন।

দুই নেতার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় কিছু মিল রয়েছে। দুজনই দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে ছিলেন। দু’জনের বিরুদ্ধেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে।

একজনকে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকতে হয়েছে, অন্যজনকে কাটাতে হয়েছে দীর্ঘ সময় কারাগারে। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন এবং সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।

এ কারণে পুত্রজায়ায় তাদের একসঙ্গে দেখা যাওয়ার ঘটনাকে অনেকেই শুধু একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছেন না।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি দুই ভিন্ন দেশের দুই নেতার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলারও একটি প্রতীকী মুহূর্ত। একজন নির্বাসনজীবন শেষে দেশে ফিরে সরকারপ্রধান হয়েছেন, অন্যজন কারাবাস ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে পৌঁছেছেন।

সে অর্থে পুত্রজায়ার এই ফ্রেমে কেবল দুই সরকারপ্রধানই নন, তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার প্রতিফলনও চোখে পড়ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের লেন্সে।

Scroll to Top