রাজধানীর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করতে ডেসকোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু সেই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটিই এখন এক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে!
|
যেখানে দেশজুড়ে চলছে সুশাসন ফেরানোর লড়াই, ঠিক তখনই ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি, ডেসকো-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদ ও তার সিন্ডিকেট বাণিজ্যের নতুন রেকর্ড গড়ছে। ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের অনুগত থেকে ফায়দা লোটার পর ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনে খোলস বদলে তিনি এখন ডেসকোতে নিজের চেয়ার পাকাপোক্ত করতে ব্যস্ত। অথচ তার নিয়োগের তালিকায় নামই ছিল না!
|
অনুসন্ধানে জানা যায়, তৎকালীন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফয়জুল কবির খানের বিশেষ সুপারিশে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েই তিনি ডেসকোতে শুরু করেন লুটপাটের রাজত্ব। ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট নিজ উদ্যোগে জাতীয় শোক দিবসে শেখ পরিবারের জন্য মিলাদ ও দোয়া মাহফিল করা এই কর্মকর্তা এখন খোলস পাল্টে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। শুধু তাই নয়, তার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ভূমিদখল ও জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ক্যান্টনমেন্ট থানায় সি.আর মামলাসহ চট্টগ্রামের আদালতে দুটি মামলা বিচারাধীন। অ্যাসিউর গ্রুপের সিইও থাকাকালীন তার ভূমিদস্যুতার গল্প নিয়ে ইতিপূর্বে এশিয়ান টিভিতে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনও প্রচারিত হয়েছে। এমনকি জনপ্রিয় সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিনের উপস্থাপনায় আমেরিকার ‘ঠিকানা’ টিভিতে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ তাকে চিহ্নিত ভূমিদস্যু হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।
|
ডেসকোতে যোগ দিয়েই শামীম আহমেদ গঠন করেন এক ভয়ংকর ফ্যাসিস্ট সিন্ডিকেট। জুলাই বিপ্লববিরোধী এবং গুপ্ত সংগঠনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পদায়ন করেছেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদায়ন করা হয়েছে এমন চারজনকে, যারা ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। অথচ জুলাই বিপ্লব ধারণকারী ও বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদে পদে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে।
|
সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, শেখ রেহানা ও তার পুত্র রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির মালিকানাধীন অখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘Oculin Tech BD Ltd’-এর সাথে স্মার্ট প্রি-পেইড মিটারের সফটওয়্যার সরবরাহের নামে ১৬৭ কোটি টাকার প্রথম চুক্তি করা হলেও তা বাড়তে বাড়তে ৩৮৫ কোটিতে ঠেকেছে। নিম্নমানের সেবা দিয়ে কাজের সমাপ্তি না করেই বিগত আড়াই বছরে তুলে নেওয়া হয়েছে ৮০ শতাংশ টাকা! এই লুটপাটের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ডেসকো এমডির ডানহাত এবং বারিধারার সাবেক প্রভাবশালী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সায়েদুর রহমান। ৫ আগস্টের পর নিজেকে রাতারাতি বিএনপিপন্থী সাজিয়ে এবং প্রভাবশালী কিছু নেতার নাম ভাঙিয়ে তিনি অবৈধ উপায়ে বাগিয়ে নেন প্রকল্প পরিচালক পদ।
|
সম্প্রতি ডেসকো এমডি এবং প্রকল্প পরিচালক সায়েদুর রহমান কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বা বোর্ডের ‘আর্থিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালা-২০২১’ লঙ্ঘন করে প্রায় ১৬০ কোটি টাকার বিল গোপনে ছাড় করার পাঁয়তারা করেছেন। যেখানে ২৫ লাখ টাকার বেশি বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও অর্থ ও হিসাব দপ্তরে মতামত বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমোদনের কথা, সেখানে মহা-দুর্নীতিবাজ সায়েদুর রহমানের সাথে যোগসাজশে এই বিশাল অঙ্কের টাকা অবৈধভাবে পরিশোধের চেষ্টা চলছে। তবে ডেসকোর অর্থ ও হিসাব বিভাগের সৎ ও নিয়ম-নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা এই অনৈতিক ফাইলে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে সেই দুর্নীতি আটকে রয়েছে।
|
বর্তমানে আওয়ামী লীগ আমলে গঠিত ডেসকো বোর্ড এই চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ এমডির চুক্তি আরও তিন বছর নবায়নের জন্য জোরেশোরে সুপারিশ করেছে—যা ডেসকোর সব সৎ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চরমভাবে মর্মাহত করেছে। সাধারণ কর্মীদের একটাই দাবি, আগামীর বাংলাদেশ গঠনে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুর্নীতিমুক্ত ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয়কে বাস্তবায়ন করতে হলে এই দুর্নীতিবাজ দোসরকে অবিলম্বে পদ থেকে অপসারণ করে আইনের আওতায় আনা হোক।



