স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ভিত্তি করে যেসব রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠেছে, তাদের প্রতি তার পরামর্শ— কেবল জুলাইয়ের চেতনার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন রাজনীতি করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, যারা শুধু সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টা হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে জুলাইকে ব্যবহার করেছেন, তাদের এখনই জনগণের সামনে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরতে হবে। তারা যদি নতুন রাজনীতির কথা বলেন, তবে সেটি যেন পুরোনো রাজনৈতিক ধারা অনুসরণ না করে। নতুন রাজনীতির কথা বলে আবার পুরোনো বন্দোবস্তের মতো আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা গ্রহণযোগ্য নয়।
রোববার (১৯ জুলাই) বিকেলে গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) আয়োজিত ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব বক্তব্য দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বলতে কী বোঝানো হচ্ছে। শুধু ‘দায় ও দরদের রাজনীতি’ কিংবা ‘নতুন রাজনীতি’— এমন আকর্ষণীয় শব্দ ব্যবহার করলেই হবে না। এসব ধারণার বাস্তব রূপ কী, জনগণ তা জানতে চায়। মানুষ যদি সেই নতুন রাজনৈতিক দর্শন গ্রহণ করে, তাহলে জনগণ অবশ্যই তাদের পাশে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে জুলাইয়ের চেতনার কথা বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। যারা বারবার ১৯৪৭ সালের প্রসঙ্গ টানেন, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইতিহাসকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করা ঠিক নয়। একাত্তরকে অস্বীকার করে কিংবা অতীতকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে বর্তমান বাস্তবতায় মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে কিংবা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে রাজনীতি করলে দেশের কোনো উপকার হবে না। ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ১৯৪৭, ১৯৭১ কিংবা ২০২৪ সালের ঘটনাবলি ব্যবহার করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট। দেশে আর কখনো ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে জনগণকে আর রাজপথে রক্ত দিতে না হয়— এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য অটুট রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও ভিন্নমত থাকতেই পারে। সংসদের ভেতরে-বাইরে মতবিনিময় হবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিভক্তি সৃষ্টি হলে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের সুযোগ তৈরি হবে, যা দেশের জন্য ক্ষতিকর।
মব জাস্টিস প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো অবস্থাতেই মব জাস্টিসকে ন্যায়বিচার বলা যায় না। এটি মূলত একটি অপসংস্কৃতি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগে এমন প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল। আইনের শাসন সুসংহত হলে এ ধরনের পরিস্থিতি আর তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রশাসন ও আইনসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এর কার্যকর বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিচার বিভাগের। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত হলে তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। তার মতে, বিচার বিভাগ এখন অনেকটাই স্বাধীন। তবে অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়িত্ব পালন করেছেন— এমন কিছু বিচারক ও বিচারিক কর্মকর্তার ভূমিকার কারণে এখনো ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়নে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে বিচার বিভাগের কিছু সদস্যও ছিলেন। রাতের ভোটের নির্বাচনে সহযোগিতা করা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনার যথাযথ মূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে আইনের শাসনকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।



