৪৮ দলের অংশগ্রহণে গড়াতে চলা ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ গড়াতে বাকি আর পাঁচদিন। যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা ও মেক্সিকোতে গড়াতে চলা আসরটিতে নতুন ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় জার্মানির। ২০১৪ বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের পর ২০১৮ এবং ২০২২ সালে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেয় চারবারের চ্যাম্পিয়নরা। পঞ্ম শিরোপা জয়ের মিশনে নামা জার্মানির গ্রুপপর্বে অবশ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। গ্রুপ-ই তে জুলিয়ান নাগেলসম্যান শিষ্যদের বড় বাধা ইকুয়েডর ও আইভরি কোস্ট। এমনকি লড়াই করতে জানে দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও-ও।
কাগজে-কলমে এবং শক্তিমত্তায় এই গ্রুপে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবে জার্মানি। তবে গত দুই বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার দুঃস্মৃতি এখনো তাদের তাড়া করছে। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার ইকুয়েডর ও গতি ও শারীরিক শক্তিতে ভরপুর আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্টের বর্তমান ফর্ম জানাচ্ছে লড়াইটা বেশ হবে গ্রুপজুড়ে। আর সব হিসাব ওলোটপালোট করে দিতে ওত পেতে আছে প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে নাম লেখানো উত্তর আমেরিকার দল কুরাসাও।
‘ই’ গ্রুপ দেখে সহজ মনে হলেও, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে জার্মানিকে সতর্ক থাকতে হবে। উত্তর আমেরিকার মাটিতে এই মিশন তাই জার্মানির জন্য কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং ফুটবলে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া জায়গা ফিরে পাওয়ার লড়াই। শক্তিমত্তা ও ইতিহাসের বিচারে কে কতটা এগিয়ে, চলুন দেখে নেওয়া যাক চ্যানেল আই অনলাইনের বিশ্লেষণ এক নজরে।
ফিফার সবশেষ প্রকাশিত র্যাঙ্কিংয়ে ‘ডি’ গ্রুপে সবার চেয়ে এগিয়ে জার্মানি। ১০ নম্বরে আছে তারা। এরপরই অবস্থান ইকুয়েডরে, র্যাঙ্কিংয়ে ২৪ নম্বরে দেশটি। ২৩ নম্বরে থাকা আইভরি কোস্ট আছে তৃতীয় স্থানে। সবার শেষে অবস্থান করা কুরাসাও’র ফিফা র্যাঙ্কিং ৮৩তম।
জার্মানি
বিশ্বকাপের মঞ্চে জার্মানি নামটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৫৪ সালের ‘মিরাকল অফ বার্ন’ কিংবা ২০১৪ সালে ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারানোর স্মৃতি, এবং শিরোপা জয়। আর অন্যদিকে ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায়ের ক্ষত। এই দুই অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়েই টানা ১৯ বারের মতো বিশ্বমঞ্চে নামছে দলটি। ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর ২০১৪ সালে জার্মানির হাতে ওঠে চতুর্থ শিরোপা।
বাছাইপর্বের অমসৃণ শুরুর পর চোটজর্জর দলটি দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে কাটে মূলপর্বের টিকিট। তবে এই টিকিট পাওয়ার লড়াই সহজ ছিল না, জামাল মুসিয়ালা, কাই হাভার্টজ, নিকলাস ফুলক্রুগ ও গোলরক্ষক মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেনের মতো ফুটবলারদের ছাড়াই জার্মানিকে বাছাইপর্ব পার হতে হয়েছে। এই চোটের কারণে দলের গতি যেমন কমেছে, তেমনই কোচকেও বাধ্য করেছে বিকল্প পথ খুঁজতে।
২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের আগে দলের দায়িত্ব নেন নাগেলসম্যান। তার অধীনে জার্মানি এখন মাঠের নিয়ন্ত্রণে এবং রক্ষণভাগে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তবে কাউন্টার অ্যাটাকের চিরাচরিত জার্মান ধাঁচটি বজায় থাকছে। জসুয়া কিমিখ ও ডেভিড রাউমের মতো ফুলব্যাকরা যখন প্রান্ত ছেড়ে ভেতরের দিকে ঢুকে মিডফিল্ডারের ভূমিকায় খেলেন, তখন চাপ তৈরি হয় প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে। এরপর আছেন জামাল মুসিয়ালা এবং ফ্লোরিয়ান ভির্টজ। দুই প্লেমেকারের ফর্মের ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বকাপে দেশটির গতিপথ। জার্মানি অবশ্য এখনও স্বরূপে ফিরতে পারেনি, তবে এই বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার।
ইকুয়েডর
লাতিন আমেরিকার ফুটবল মানেই আক্রমণাত্মক নান্দনিকতা। তবে সেই চেনা বৃত্ত ভেঙে রক্ষণভাগে মনোযোগ দিয়ে এবারের বিশ্বকাপে এসেছে ইকুয়েডর। ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট কাটা দলটি চার বছর পর দেখা পায় সেরা সাফল্যের। ২০০৬ আসরে রাউন্ড অব সিক্সটিনে খেলেছিল তারা। এবারের আসরে অবশ্য শক্তিমত্তার জানান দিচ্ছে তারা।
লাতিন বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পয়েন্ট টেবিলের দুইয়ে থেকে মূলপর্ব নিশ্চিত করেছে ইকুয়েডর। ১৮ ম্যাচে মাত্র ৫ গোল হজম করার যে রেকর্ড তারা গড়েছে, তা আধুনিক ফুটবলে বিরল।বাছাইপর্বে ইকুয়েডর ১৩টি ম্যাচে কোনো গোল হজম করেনি। রক্ষণ শক্তিশালী হলেও আক্রমণভাগে ধারালো ফিনিশারের অভাব ইকুয়েডরের প্রধান চিন্তার কারণ। ২০০৬ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় খেলাটা সেরা সাফল্য হলেও এবার নতুন কোনো ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যেই মাঠে নামবে ইকুয়েডর।
আইভরি কোস্ট
আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা দীর্ঘ ১২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরছে। এটি তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ আসর। এর আগে ২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৪ আসরে অংশ নিলেও কখনই গ্রুপপর্বের বৈতরণী পার হতে পারেনি ‘দ্য এলিফ্যান্টস’রা। তবে এবার নতুন স্বপ্ন নিয়ে উত্তর আমেরিকায় যাচ্ছে তারা। ২০২৪ আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে ঘরের মাঠে শিরোপা জয়ের পর কোচ এমার্স ফায়ের অধীনে দারুণ ছন্দে রয়েছে আইভরি কোস্ট।
তার অধীনে আইভরি কোস্ট অত্যন্ত গতিশীল ফুটবল খেলছে। মাঝমাঠে ফ্রাঙ্ক কেসি এবং সেকো ফোফানার মতো অভিজ্ঞদের শক্তিমত্তা এবং আক্রমণে সাইমন আদিংরা ও আমাদ দিয়ালোর গতি প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে ফেলার মূল অস্ত্র।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও আইভরি কোস্ট ছিল দুর্দান্ত। পুরো বাছাইপর্বে অপরাজিত থেকে গ্রুপচ্যাম্পিয়ন হয় তারা। এমনকি ১০ ম্যাচে একটিও গোল হজম করেনি দলটি। শক্তিশালী রক্ষণ, অভিজ্ঞ মিডফিল্ড এবং তরুণ আক্রমণভাগ নিয়ে এবার নকআউট পর্বে ওঠার স্বপ্ন দেখছে তারা।
কুরাসাও
ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের ছোট্ট দ্বীপদেশ কুরাসাও। মাত্র দেড় লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার দেশটি কনকাকাফ অঞ্চলের বাছাইপর্বে গ্রুপ ‘বি’-এর শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে খেলা সবচেয়ে ছোট দেশের রেকর্ডও গড়ে ১৭১ বর্গমাইল আয়তনের কুরাসাও।
২০১৭ সালে ক্যারিবিয়ান কাপের ফাইনালে জামাইকাকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো কনকাকাফ গোল্ডকাপে জায়গা করে নেয় কুরাসাও। এরপর ধীরে ধীরে নিজেদের শক্তি বাড়াতে থাকে দেশটি। ২০১৯ গোল্ডকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা এবং কাতার ২০২২ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে শেষ ধাপে পৌঁছে যাওয়া ছিল তাদের বড় অর্জন। সেবার পানামার কাছে ২-১ ব্যবাধনে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হলেও এবার বিশ্বমঞ্চে কুরাসাও।
এক দশক আগেও যারা বিশ্ব ফুটবলে প্রায় অপরিচিত ছিল, সেই কুরাসাও এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে। ছোট্ট দেশটির এই অর্জন প্রমাণ করেছে- সঠিক পরিকল্পনা, অভিজ্ঞ কোচ এবং প্রতিভাবান ফুটবলার থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। প্রথম আসরে অবশ্য ভালো কিছুরই স্বপ্ন দেখছে তারা।
সবমিলিয়ে গ্রুপ-ই থেকে এগিয়ে থাকবে জার্মানি। ঐতিহ্যে এবং দলীয় শক্তিমত্তায় গ্রুপচ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরের রাউন্ডে যাওয়ার দৌড়ে থাকবে তারা। তবে দ্বিতীয় স্থান বা নকআউটের টিকিট পাওয়ার জন্য মূল লড়াইটি হবে ইকুয়েডর এবং আইভরি কোস্টের মধ্যে। ইকুয়েডরের ট্যাকটিক্যাল পরিপক্বতা এবং রক্ষণভাগের দৃঢ়তা তাদেরকে আইভরি কোস্টের চেয়ে সামান্য এগিয়ে রাখছে। অন্যদিকে, আইভরি কোস্ট যদি তাদের গতি এবং শক্তির সঠিক ব্যবহার করতে পারে, তবে জার্মানি বা ইকুয়েডর যেকোনো দলকেই তারা স্তব্ধ করে দিতে পারে। কুরাসাও মূলত এই গ্রুপে জায়ান্ট কিলারের ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করবে, কোনো পরাশক্তির পয়েন্ট কেড়ে নিতে পারলেই হবে তাদের বড় সাফল্য।



