
জাপানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদচিহ্ন অনুসরণ করতে গিয়ে এবার ওসাকায় পৌঁছালাম। ১৯১৬ সালের ১ জুন কোবে থেকে ওসাকায় এসেছিলেন কবি। জাপানের বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘ওসাকা আসাহি শিমবুন’-এর আমন্ত্রণে তার এই সফর। সেদিন ওসাকায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি, যা জাপানের বুদ্ধিজীবী মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
ওসাকায় রবীন্দ্রনাথের প্রথম বক্তৃতার স্থান ছিল টেন্নোজি হল। সেখানে আমার মেয়ে আনি দাঁড়িয়ে আছে, যে জায়গায় ১১০ বছর আগে কবি তার প্রথম বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেদিন দুপুরের খাবারের পর ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড জাপান’ শিরোনামে বক্তৃতা করেন রবীন্দ্রনাথ। হলের মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে বসেছিলেন তিন হাজারেরও বেশি শ্রোতা।

বিখ্যাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও অভিযাত্রী একাই কাওয়াগুচি অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথকে শ্রোতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তার বক্তব্য জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন।
এরপর কবির দ্বিতীয় বক্তৃতার স্থান হিসেবে পরিচিত নাকানশিমা হলের সামনে যাই। বর্তমানে এটি ‘ওসাকা সিটি সেন্ট্রাল পাবলিক হল’ নামে পরিচিত। ১৯১৬ সালে এই হলেই রবীন্দ্রনাথ তার দ্বিতীয় বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘দ্য মেসেজ অব ইন্ডিয়া টু জাপান’।
রবীন্দ্রনাথের এই বক্তৃতা শুরু থেকেই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল। পশ্চিমা সভ্যতার আগ্রাসী ও বস্তুবাদী প্রবণতার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। একই সঙ্গে ইউরোপে চলমান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পেছনে যে আগ্রাসী ও সাম্রাজ্যবাদী জাতীয়তাবাদ কাজ করছিল, সেই পথ অনুসরণ না করার জন্য জাপানিদের সতর্ক করেছিলেন কবি।
চন্দনা ও আনিকে দেখা যাচ্ছে ঐতিহাসিক নাকানশিমা হলের সামনে। এই স্থানেই ১১০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ তার দ্বিতীয় বক্তৃতা দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

কবির বক্তৃতা উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা পেলেও জাপানের সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। দেশটির প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘টোকিও আসাহি’ রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেখায়। পত্রিকাটি তার বক্তৃতার সংবাদ প্রকাশ করে ‘টেগোর কার্সেস সিভিলাইজেশন’ শিরোনামে। অর্থাৎ, ‘সভ্যতাকে অভিশাপ দিলেন টেগোর’।
ওসাকায় রবীন্দ্রনাথের এই দুই বক্তৃতা শুধু তার জাপান সফরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়, বরং বিশ্বমানবতা, জাতীয়তাবাদ ও সভ্যতা সম্পর্কে কবির চিন্তারও গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ১১০ বছর পর সেই ঐতিহাসিক স্থানগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, সময় বদলেছে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের উচ্চারিত প্রশ্নগুলো আজও প্রাসঙ্গিক।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…


