জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে মানবতাকে বাঁচাতে এবং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আর কালক্ষেপণ না করে সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ (ইমপ্লিমেন্টেশন) শুরু করার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও এর সংশ্লিষ্ট অ্যালায়েন্স ফর ট্রান্সফরমেটিভ অ্যাকশনস অন ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথের (এটিএসিএইচ) প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেন, অনেক পরিকল্পনা ও আলোচনা হয়েছে, এখন আর শুধু আইডিয়া বা কথার কথা শোনার সময় নেই। মানুষ বাঁচাতে আমাদের এখনই কাজ দেখাতে হবে।
বৃহস্পতিবার ২৫ জুন ফ্রান্সের স্থানীয় সময় ফ্রান্সের প্যারিসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ‘এটিএসিএইচের জন্য সুপারিশ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলসহ জলবায়ু-সহনশীল ও স্বল্প-কার্বন নিঃসরণকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার প্রতিশ্রুতি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সভায় এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ‘অ্যালায়েন্স ফর ট্রান্সফরমেটিভ অ্যাকশনস অন ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ’-এর যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী এ সভার আয়োজন করা হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন তার বক্তব্যে ফ্রান্সে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবার এবং ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বিশেষ করে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কথা তুলে ধরেন।
উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, কক্সবাজার থেকে শুরু করে সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের এক বিশাল উপকূলীয় এলাকায় এখন তীব্র সুপেয় পানির অভাব দেখা দিয়েছে। চারপাশের পানি লবণাক্ত ও দূষিত হয়ে পড়েছে, যা পানের অযোগ্য তো বটেই, এমনকি গোসল বা নিত্যদিনের ধোয়া-মোছার কাজেরও অনুপযোগী। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে সাধারণ কিংবা গভীর নলকূপ দিয়েও এখন পৃষ্ঠতলে পানি তোলা যাচ্ছে না। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও সমাধান করা উচিত।
দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে রোগব্যাধির প্রকোপ কমাতে বিশেষ অর্থায়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, কম ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব অঞ্চলে ইতোমধ্যে সংক্রামক (কমিউনিকেবল) ও অসংক্রামক (নন-কমিউনিকেবল) রোগব্যাধি মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকা এসব রাষ্ট্রকে রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ স্বাস্থ্য তহবিল (ক্লাইমেট ফাইন্যান্স ফর হেলথ) গঠনের দাবি জানান তিনি।
সাখাওয়াত হোসেন দেশের বায়ুদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আমাদের মতো অনেক দেশেই এখনো প্রাচীন বা সনাতন পদ্ধতিতে কয়লা পুড়িয়ে ইটভাটায় কাজ চলছে, যা থেকে প্রচুর ক্ষতিকর ধোঁয়া ও গ্যাস নির্গত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কংক্রিট স্ল্যাব বা আধুনিক ব্লক তৈরির প্রযুক্তি গ্রহণ করা জরুরি। আর এই রূপান্তরের জন্য বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
বহুমুখী সমন্বয় ও কারিগরি সহায়তার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন পরিমাপের জন্য ব্যবহারিক নির্দেশিকা তৈরি এবং স্বাস্থ্য, পরিবেশ, জ্বালানি ও পানি খাতের মধ্যে বহুমুখী সমন্বয় (মাল্টি-সেক্টরাল কোলাবোরেশন) গড়ে তুলতে বিশ্ব সংস্থাকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। আক্রান্ত দেশগুলোর সরকারি পর্যায়ে আলোচনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন ও প্রশিক্ষিত করতে প্রতিনিধি দল পাঠানোর পরামর্শ দেন তিনি।
এটি মানবতা রক্ষার লড়াই এবং বিশ্ব সংস্থা অলস বসে না থেকে পুরোপুরি কার্যকর সংস্থায় রূপান্তরিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
মন্ত্রী আরও জানান, আমরা জলবায়ু-সহনশীল ও স্বল্প-কার্বন নিঃসরণকারী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছি। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইতোমধ্যেই আমাদের জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। এর ফলে রোগের প্রকোপ বাড়ছে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। প্রথমেই আমরা দেশে জলবায়ু ও স্বাস্থ্য বিষয়ক ঝুঁকির মূল্যায়ন করেছি এবং পরবর্তীতে ‘স্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৬-৩০’ (এইচএনএপি) প্রণয়ন করেছি। এটি জলবায়ু-সহনশীল ও স্বল্প-কার্বন নিঃসরণকারী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রদান করে।
তিনি আরও বলেন, আমরা সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের আকারে জলবায়ু-সংবেদনশীল প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। উদাহরণস্বরূপ, ডেঙ্গু ও অন্যান্য ভেক্টর-বাহিত রোগ, পানিবাহিত রোগ এবং তাপ ও বায়ুদূষণজনিত অসুস্থতা (যেমন স্ট্রোক ও সিওপিডি)-কে এই অভিযোজন পরিকল্পনায় উচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অপুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা, মাতৃ, নবজাতক ও প্রজনন স্বাস্থ্য, মানসিক চাপ, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং দুর্যোগ ও জলবায়ুজনিত কারণে সৃষ্ট মানসিক আঘাত (ট্রমা) ও সামাজিক ঝুঁকির বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ সময় নেদারল্যান্ডসের স্বাস্থ্য, কল্যাণ ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি জেনারেল অনিতা ভ্যান ডে আন্দে এবং ফিলিপাইনের স্বাস্থ্য বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি ড. গ্লোরিয়া জে. বালবোয়া-সহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ইউনিসেফের আমন্ত্রণে ২১ জুন ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে গিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। সেখান থেকে ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আমন্ত্রণে ২৪ জুন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে যান। আগামী ২৭ জুন, শনিবার তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।




