চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের রাজত্ব: আজ স্বাক্ষরিত হচ্ছে চুক্তি – DesheBideshe

চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের রাজত্ব: আজ স্বাক্ষরিত হচ্ছে চুক্তি – DesheBideshe


চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের রাজত্ব: আজ স্বাক্ষরিত হচ্ছে চুক্তি – DesheBideshe

চট্টগ্রাম, ০৮ অক্টোবর – দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) পরিচালনার দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুপরিচিত দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ (DP World)-এর হাতে। আজ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় আমিরাতের এই সংস্থার সঙ্গে ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।

টার্মিনালের পরিচালনগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এই মেগা উদ্যোগ নিলেও, বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে এখন তীব্র উত্তেজনা। বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দরের মূল অংশ তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক, তথ্য প্রকাশের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা এবং বন্দর রক্ষা সংগঠনগুলোর কড়া হুঙ্কার।

হস্তান্তরের আইনি ও প্রশাসনিক রোডম্যাপ

পিপিপি প্রকল্পের আওতায় চুক্তিটির খসড়া প্রস্তাবনায় গত ১ অক্টোবর নীতিগত অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এনসিটি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আগে যেসব আইনি প্রশ্ন ও জটিলতা ছিল, গত ২৯ জানুয়ারি হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে সেগুলোর অবসান ঘটে।

উল্লেখ্য, এতদিন এনসিটি পরিচালিত হয়ে আসছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনায়।

‘কালো চুক্তি’ আখ্যা ও রাজপথে গণআন্দোলনের হুঁশিয়ারি

আইনি প্রতিবন্ধকতা কাটলেও স্থানীয় বন্দর রক্ষা কমিটি ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এই সিদ্ধান্তের কঠোর বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছে। তাদের দাবি—জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং বন্দর কেন্দ্রিক হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো মূল্যায়নে না এনেই বিদেশি সংস্থাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বচ্ছতার অভাব: গতকাল বুধবার (৭ অক্টোবর) দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু অভিযোগ করেন, হস্তান্তরের আর্থিক শর্ত বা দায়বদ্ধতার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে।

ইতিহাসের ‘কালো দিন’: জনমত ও স্থানীয় অংশীদারদের তোয়াক্কা না করে চুক্তিটি সম্পন্ন হলে তা ইতিহাসে ‘কালো চুক্তি’ হিসেবে গণ্য হবে বলে মন্তব্য করে সংগঠনটি অবিলম্বে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার আল্টিমেটাম দিয়েছে।

তথ্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা: গণমাধ্যম ও সিইউজের তীব্র অসন্তোষ

চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক দুদিন আগে, গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক জরুরি নির্দেশনার মাধ্যমে বন্দরের যাবতীয় সংবেদনশীল স্থাপনা ও অপারেশনাল কর্মকাণ্ডের ভিডিও বা তথ্য ধারণ করে সংবাদ মাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (ISPS Code) ও বন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতেই এই পদক্ষেপ বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।

সাংবাদিক ইউনিয়নের উদ্বেগ: চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে)-এর সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ এক বিবৃতিতে বলেন, “নিরাপত্তার অজুহাতে নিরপেক্ষ সংবাদের তথ্য সংগ্রহ আটকে দেওয়া সংবিধান এবং তথ্য অধিকার আইনের পরিপন্থি”। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের মুহূর্তে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি জনমনে গুরুতর সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে মন্তব্য করে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান তাঁরা।

কাস্টমসের আল্টিমেটাম: অনাদায়ি কনটেইনার পুনঃনিলাম ও ধ্বংসের নির্দেশ

একদিকে যখন এনসিটি হস্তান্তর নিয়ে চট্টগ্রামজুড়ে তোড়জোড়, অন্যদিকে বন্দরে দীর্ঘদিন জমে থাকা নিলামযোগ্য পণ্য খালাসের নির্ধারিত চূড়ান্ত সময়সীমাও গতকাল (৭ অক্টোবর) শেষ হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার নাজমুল হোসেন জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব আমদানিকারক পণ্য খালাস করেননি, প্রচলিত কাস্টমস আইন প্রয়োগ করে সেসব পণ্য পুনঃনিলাম করা হবে অথবা ধ্বংস করা হবে। বন্দরে বিরাজমান কনটেইনার জট নিরসন ও আটকে থাকা রাজস্ব আদায়ের স্বার্থেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এনএন/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬

Scroll to Top