গুম বিষয়ক প্রস্তাবিত আইন ভিকটিমের সরাসরি ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম করবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী | চ্যানেল আই অনলাইন

প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’ গুমের শিকার ব্যক্তিদের সরাসরি আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার পথ সুগম করবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত ‘টু মেক দ্য ডিজাপেয়ার্ড এপিয়ার: ল, জাস্টিস, অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা ও বিশেষ চিত্র প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পরে বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টেও তার বক্তব্যের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে না ফেলে সরাসরি আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।

তিনি জানান, গত ২৭ আগস্ট ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে গুমের ধরন ও অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকলে পাঁচ বছর পর আদালতের অনুমতি নিয়ে তার ওয়ারিশদের সম্পত্তির অধিকার পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। দায়ী পক্ষ ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনটি বর্তমানে সংসদীয় কমিটিতে রয়েছে। এতে প্রয়োজনীয় ও ভালো পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে।

বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখের কথিত গুমের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ’ ও ‘অপারেশন সুন্দরবন’ পরিচালনার মাধ্যমে জলদস্যু ও বনদস্যুদের কোণঠাসা করা হয়েছে। এ কারণে তাদের ক্ষোভ থেকে কোস্টগার্ডের অফিসে হামলার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে।

তিনি বলেন, মিরাজ শেখের বিষয়ে দস্যু দলগুলোর নিজেদের মধ্যে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। নিরপেক্ষ তদন্তেও কোনো সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনে যেকোনো নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনে প্রস্তুত রয়েছে।

বর্তমান সরকারের গত ছয় মাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, এ সময়ে কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুমের ঘটনা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও পেশাদার করে গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতাভিত্তিক নতুন এলিট ফোর্স ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠনের আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে।

অনুষ্ঠানে নিজের গুমের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, তাকে অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে ৫ বাই ১০ ফুটের একটি কক্ষে দীর্ঘদিন বন্দি রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল। সেখানে কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থাও ছিল না এবং প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুর আশঙ্কায় কাটত বলে জানান তিনি।

বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি। পরে চোখ বেঁধে তাকে ভারতের শিলংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘনের মামলায় সেখানে সাড়ে নয় বছর আইনি লড়াই করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত ভারতীয় আদালত তাকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেন বলে জানান মন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলির সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন, আলোকচিত্রী শহীদুল আলম ও নেত্র নিউজের এক্সিকিউটিভ এডিটর নাজমুল আহসানসহ অনেকে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

এর আগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে গুম ও নির্যাতনের ওপর আয়োজিত সাত দিনব্যাপী বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রদর্শনীটি ২৯ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।

Scroll to Top