ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ডিজিটাল প্রতিযোগিতায় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলকে ৮৯০ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১০০ কোটি ডলার) জরিমানা করেছে। ইইউর অভিযোগ, গুগল তাদের সার্চ ইঞ্জিন ও গুগল প্লে স্টোরে ব্যবহারকারীদের প্রতিদ্বন্দ্বী সেবার পরিবর্তে নিজেদের অ্যাপ ও সেবার দিকে পরিচালিত করেছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ঘোষিত এই জরিমানাকে বিগ টেক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্রাসেলসের চলমান কঠোর অবস্থানের সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে ইইউ দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
এর আগে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের আধিপত্য ব্যবহার করে প্রতিযোগিতা সীমিত করা এবং ভোক্তাদের পছন্দের সুযোগ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগে গুগলের বিরুদ্ধে আরোপিত ৪৫০ কোটি ডলারের অ্যান্টিট্রাস্ট জরিমানার বিরুদ্ধে করা আপিলও সম্প্রতি খারিজ হয়।
ইইউর নির্বাহী সংস্থা ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে।
কমিশনের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট তেরেসা রিবেরা বলেন, ‘সেরা পণ্য কেবল ভালো হওয়ার কারণেই সফল হবে, সার্চ ইঞ্জিন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন হওয়ার কারণে নয়। ইউরোপীয় ভোক্তাদের অধিকার রয়েছে অ্যাপ ডেভেলপারদের কাছ থেকে সেরা অফারের তথ্য জানার, এমনকি তাতে অ্যাপ স্টোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো কমিশন না থাকলেও।’
ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র থমাস রেনিয়ে বলেন, ‘ইইউতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ন্যায্যভাবে প্রতিযোগিতা করার অধিকার রয়েছে। গেটকিপার প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের সাশ্রয়ী বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।’
ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট (ডিএমএ) অনুযায়ী একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এটিই সবচেয়ে বড় সম্মিলিত জরিমানা। এর আগে ২০২৫ সালে একই আইনের আওতায় মেটাকে ২০ কোটি ইউরো এবং অ্যাপলকে ৫০ কোটি ইউরো জরিমানা করেছিল ইইউ।
২০২৪ সালে কার্যকর হওয়া ডিএমএর লক্ষ্য হলো ডিজিটাল বাজারে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা।
২০২৪ সালে শুরু হওয়া তদন্তের অংশ হিসেবে গুগলের বিরুদ্ধে এই জরিমানা কয়েক মাস ধরেই প্রত্যাশিত ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাবের আশঙ্কায় ইইউ সিদ্ধান্তে দেরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছিল।
ডিএমএ অনুযায়ী, আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক মোট আয়ের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা যেতে পারে। ইইউর এক কর্মকর্তা জানান, গুগলের ক্ষেত্রে ঘোষিত জরিমানার পরিমাণ প্রতিষ্ঠানটির মোট আয়ের প্রায় শূন্য দশমিক ২২ শতাংশ।
কমিশন জানিয়েছে, ৬০ দিনের মধ্যে গুগল নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করলে নিয়মিত অতিরিক্ত আর্থিক জরিমানাও আরোপ করা হতে পারে।
গুগলের গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স প্রধান কেন্ট ওয়াকার অভিযোগ করেন, ইইউর সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপের ব্যবহারকারীদের জন্য জনপ্রিয় কিছু সুবিধা সরিয়ে ফেলতে প্রতিষ্ঠানটিকে বাধ্য করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন সব তাৎক্ষণিক সার্চ সুবিধা সরিয়ে ফেলতে বলা হচ্ছে, যেগুলো ইউরোপীয় ব্যবহারকারীরা পছন্দ করেন। যেমন হোটেল, ফ্লাইট ও রেস্তোরাঁর তাৎক্ষণিক মূল্য ও প্রাপ্যতার তথ্য। পাশাপাশি গুগল প্লের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল করতে বলা হচ্ছে। এটি ন্যায্য প্রতিযোগিতা নয়।’
২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ইইউ গুগলকে মোট ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো জরিমানা করেছিল। এছাড়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে পৃথক একটি অ্যান্টিট্রাস্ট মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে আরও ২ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ইউরো জরিমানা করা হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইইউর বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন।
তবে এবারও সম্ভাব্য মার্কিন প্রতিক্রিয়া নিয়ে ইইউ উদ্বিগ্ন নয় বলে জানিয়েছেন তেরেসা রিবেরা। তিনি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব হলো আমাদের সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানগুলোর গৃহীত আইন যথাযথভাবে কার্যকর ও প্রয়োগ করা।’
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের প্রতিযোগিতাবিষয়ক মামলা চলছে এবং সেখানকার কর্তৃপক্ষও অনুরূপ বিষয় নিয়ে কাজ করছে।
চলতি বছর ডিজিটাল বিধিমালা নিয়ে মতপার্থক্য নিরসনে আলোচনায় বসতে সম্মত হলেও এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেনি ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির ২৫ জন আইনপ্রণেতা এক চিঠিতে ইইউর ‘বৈষম্যমূলক’ ডিজিটাল নীতির বিরুদ্ধে বাণিজ্য তদন্তসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাদের মতে, এসব তদন্তের ফলে ইইউর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পথও খুলে যেতে পারে।

