গঙ্গা চুক্তি নবায়ন: পটভূমি, শর্ত ও নতুন করে আলোচনার কারণ | চ্যানেল আই অনলাইন

গঙ্গা চুক্তি নবায়ন: পটভূমি, শর্ত ও নতুন করে আলোচনার কারণ | চ্যানেল আই অনলাইন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধ্বস বিজয়ের পর নতুন সরকারের অগ্রাধিকারগুলোর একটি হবে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, সরকার “বাংলাদেশের স্বার্থ” অগ্রাধিকার দেবে।

উত্তেজনা থেকে চুক্তি
গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধের সূচনা ১৯৫০-এর দশকে, যখন ভারত পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কায় বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। ১৯৬১ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে ১৯৭৫ সালে বাঁধ চালু হয়। এর মাধ্যমে গঙ্গা থেকে পানি সরিয়ে হুগলি নদীতে প্রবাহিত করা হয়, যাতে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় থাকে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শুরু থেকেই আপত্তি জানায়। ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানী “ফারাক্কা লং মার্চ” নেতৃত্ব দেন, অভিযোগ তোলেন, ব্যারাজের কারণে পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ কমে মরুকরণ বাড়ছে।

১৯৭৭, ১৯৮২ ও ১৯৮৫ সালে কয়েকটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। অবশেষে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

চুক্তির প্রধান শর্ত
চুক্তিটি জানুয়ারি থেকে মে শুষ্ক মৌসুমে পানি ভাগাভাগির কাঠামো নির্ধারণ করে। ১৯৪৯–১৯৮৮ সালের গড় প্রবাহের তথ্যের ভিত্তিতে ১০ দিন মেয়াদি তিন স্তরের বণ্টনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়:

৭০,০০০ কিউসেক বা কম প্রবাহ হলে: দুই দেশ সমান ভাগ পাবে।
৭০,০০০-৭৫,০০০ কিউসেক হলে: বাংলাদেশ পাবে ৩৫,০০০ কিউসেক, বাকিটা ভারত।
৭৫,০০০ কিউসেক বা বেশি হলে: ভারত পাবে ৪০,০০০ কিউসেক, বাকিটা বাংলাদেশ।

এ ছাড়া ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময়ে বিকল্প তিনটি ১০ দিন মেয়াদে উভয় দেশকে ন্যূনতম ৩৫,০০০ কিউসেক পানি নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে।

চুক্তির জরুরি ধারা অনুযায়ী, যদি ফারাক্কায় প্রবাহ ৫০,০০০ কিউসেকের নিচে নেমে যায় তাহলে দুই দেশ অবিলম্বে বৈঠকে বসে ন্যায্যতা ও ‘কোনো পক্ষের ক্ষতি নয়’ নীতির ভিত্তিতে সমাধান খুঁজবে।

বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব প্রথমে যৌথ কমিটির, প্রয়োজনে তা জয়েন্ট রিভার কমিশনে যাবে। ১৯৭২ সালে গঠিত এই কমিশন দুই দেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী নিয়ে কাজ করে, যদিও আনুষ্ঠানিক চুক্তি রয়েছে শুধু গঙ্গা নিয়ে।

কেন নতুন করে আলোচনা?
সময়ের সঙ্গে দুই দেশেই জনসংখ্যা বেড়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তীব্র হয়েছে। ফলে চুক্তির শর্ত বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উঠে আসে, ভারত মার্চ-মে সময়ে অতিরিক্ত ৩০,০০০–৩৫,০০০ কিউসেক পানি চায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ ফেব্রুয়ারি–মে সময়ে ৪০,০০০ কিউসেক নিশ্চিত প্রবাহ, দীর্ঘমেয়াদি নবায়ন এবং উন্নত বন্যা তথ্য আদান–প্রদানের দাবি তুলেছে।

এ প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক টানাপোড়েনও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি, তার ভারতে অবস্থান এবং প্রত্যর্পণ ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালে পেহেলগাম হামলার পর ভারত একতরফাভাবে ইন্দাস ওয়াটার ট্রিটি (সিন্ধু জল চুক্তি) স্থগিত করায় বাংলাদেশেও সতর্কতা বেড়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা। ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে স্থগিত হয়েছিল, যা ভবিষ্যৎ আলোচনায়ও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

সামনে কী?
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন চুক্তিতে ন্যায্য বণ্টনের পাশাপাশি পরিবেশগত স্থিতিশীলতা, জলবায়ু অভিযোজন এবং তথ্যভিত্তিক বন্যা ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

সবশেষে, গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, গঠনমূলক সংলাপ এবং একে অপরের বাস্তব উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর। একটি স্থিতিশীল ও সহযোগিতামূলক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই এ আলোচনার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

Scroll to Top