ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৫ জন নিহতের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে শোক ও নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
নিহতদের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে কোমলমতি শিশু। ইরান এই হামলার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করলেও ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের পক্ষ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি নিয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো যে ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের অবস্থান: ‘ভুল লক্ষ্যবস্তু’ নাকি ‘অস্বীকৃতি’?
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচার করছে। তবে তাদের প্রতিবেদনে হামলার দায় স্বীকারের চেয়ে আত্মরক্ষামূলক যুক্তিই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস: তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ওই অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছিল। পেন্টাগনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, ‘‘বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু বা স্কুল আমাদের তালিকায় ছিল না। যদি এমন কিছু ঘটে থাকে, তবে তা যান্ত্রিক ত্রুটি বা ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ফল হতে পারে।’’
সিএনএন: সিএনএন-এর প্রতিবেদনে হামলার পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞের স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সিএনএন-কে বলেন, ‘‘আমরা এই প্রাণহানির ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত। তবে ইরান এই ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার।’’
ওয়াশিংটন পোস্ট: পত্রিকাটি তাদের সম্পাদকীয়তে প্রশ্ন তুলেছে যে, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করা মার্কিন প্রযুক্তিতে এত বড় ভুল কীভাবে সম্ভব? তারা নিহত ১৬৫ জন শিশুর পরিবারের আর্তনাদ নিয়ে একটি হৃদয়বিদারক ফিচার প্রকাশ করেছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ও আইডিএফ-এর দাবি:
ইসরায়েলের প্রধান সারির সংবাদমাধ্যমগুলো এবং তাদের সামরিক মুখপাত্ররা প্রথম থেকেই এই হামলার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে আসছে।
দ্য জেরুজালেম পোস্ট: ইসরায়েলি এই সংবাদমাধ্যমটি দাবি করেছে যে, যে স্কুলটিতে হামলা হয়েছে, সেটি ইরানি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) একটি গোপন অস্ত্রাগারের ঠিক পাশেই অবস্থিত। তাদের দাবি অনুযায়ী, ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ওই অস্ত্রাগারে হামলা চালিয়েছিল এবং সেখানে থাকা বিস্ফোরক সেকেন্ডারি বিস্ফোরণের মাধ্যমে স্কুলে আঘাত হানে।
হারেৎজ: ইসরায়েলের এই উদারপন্থী পত্রিকাটি অবশ্য দেশটির সরকারের কড়া সমালোচনা করেছে। তারা লিখেছে, ‘‘নির্দোষ শিশুদের রক্ত কোনোভাবেই সামরিক লক্ষ্যের অজুহাতে জায়েজ করা যায় না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইসরায়েলকে এর জবাবদিহি করতে হবে।’’
আইডিএফ মুখপাত্রের বক্তব্য: ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল ড্যানিয়েল হাগারি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘‘মিনাব এলাকায় আমাদের কোনো অভিযান ছিল না। এটি ইরানের নিজস্ব কোনো মিসাইল যা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তাদের স্কুলেই পড়েছে।’’
আন্তর্জাতিক মহলে তোলপাড় ও পাল্টা দাবি
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনা (IRNA) এই ঘটনাকে ‘শতাব্দীর জঘন্যতম শিশুহত্যা’ বলে অভিহিত করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, এই রক্তের বদলা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
মিনাব শহরের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হামলার সময় শিক্ষার্থীরা মধ্যাহ্নভোজের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং মুহূর্তেই স্কুলটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে থাকা রঙিন স্কুলব্যাগ আর রক্তভেজা বই। ১৬৫টি ছোট ছোট কাফন যখন সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়, তখন উপস্থিত কারোরই চোখের পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে আরও এক ধাপ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর এই হামলা পশ্চিমা দেশগুলোর ওপরও নৈতিক চাপের সৃষ্টি করছে।




