
ঢাকা, ০৫ অক্টোবর – ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষা ও কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পণ্য, ওষুধ কিংবা সেবা বিক্রির পর ক্রেতাকে ক্যাশ মেমো বা বিক্রয় রসিদ না দিলে বিক্রেতাকে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার সুযোগ রেখে ‘ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
২০০৯ সালের মূল ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনটি সংশোধন করে এই যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে খসড়া আইনটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
সংশোধিত খসড়া আইনের প্রধান প্রধান দিক ও ধারা
ভোক্তা অধিকারকে আরও শক্তিশালী ও যুগের উপযোগী করতে নতুন খসড়ায় বেশ কিছু স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করা হয়েছে:
১. বিক্রয় রসিদ প্রদান বাধ্যতামূলক (ধারা ৫৩ক)
খসড়া আইনের নতুন ৫৩ক ধারা অনুযায়ী, যেকোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রয়ের সময় রসিদ না দেওয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কেন এই বাধ্যবাধকতা? বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কেনাকাটার পর পণ্যের মূল্য, বিক্রেতার পরিচয় ও লেনদেনের প্রধানতম প্রমাণ হলো এই রসিদ। কোনো ভোক্তা প্রতারিত হলে বা ক্ষুণ্ন অধিকার নিয়ে অভিযোগ জানাতে গেলে ক্যাশ মেমোই প্রধান আইনি প্রমাণক হিসেবে কাজ করবে।
২. মোড়কজাত পণ্যে স্পষ্ট তথ্যের বাধ্যবাধকতা
প্যাকেটজাত বা মোড়কজাত পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে প্যাকেটের গায়ে নিচের তথ্যগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে:
- পণ্যের ওজন, পরিমাণ ও নির্দিষ্ট উপাদান
- ব্যবহারের সঠিক নিয়মাবলী ও ব্যাচ নম্বর
- সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP), উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ
- উৎপাদনকারী, প্যাকেটজাতকারী ও আমদানিকারকের নাম ও পূর্ণ ঠিকানা
প্যাকেটের গায়ে এসব তথ্য অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও পণ্য প্রদর্শন বা বিক্রি করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ধরা হবে।
৩. ভেজাল ও নকল পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি
নকল ও ভেজাল পণ্যের অপরাধের সংজ্ঞা ও আওতা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এখন থেকে নকল বা ভেজাল পণ্য/ওষুধ কেবল তৈরি করাই নয়; তা আমদানি, মজুত, সরবরাহ, বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব করাকেও আইনি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
৪. অনলাইন জুয়া ও অননুমোদিত বিজ্ঞাপনে কারাদণ্ড (ধারা ৪১ক)
ডিজিটাল কমার্স ও ই-কমার্স খাতের শৃঙ্খলা আনতে নতুন ৪১ক ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে:
- ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা মার্কেটপ্লেসে আইন দ্বারা নিষিদ্ধ কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবার তথ্য ও বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা যাবে না।
- অনলাইন জুয়া (Gambling) বা বেটিংয়ের আয়োজন করা অথবা এতে সহায়তা করাকে অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে।
- প্রস্তাবিত শাস্তি: এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৩ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়ে কার্যকর হলে ই-কমার্সসহ দেশের সামগ্রিক বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য এবং ভেজাল কারবার অনেকটাই কমে আসবে।
এনএন/ ০৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রশ্ন: রসিদ না দিলে কি এখনই ১ বছর জেল হবে?
না। এটি বর্তমানে খসড়া আইনের প্রস্তাব। চূড়ান্ত আইন কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত এই নতুন শাস্তি কার্যকর হয়েছে বলা যাবে না।
প্রশ্ন: বিক্রয় রসিদ না দিলে প্রস্তাবিত শাস্তি কী?
সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রশ্ন: কোন পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে রসিদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে?
পণ্য, ওষুধ ও সেবা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা বা সেবাগ্রহীতাকে বিক্রয় রসিদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রশ্ন: মোড়কজাত পণ্যে কী কী তথ্য থাকতে হবে?
ওজন/মাত্রা, পরিমাণ, ব্যবহারবিধি, উপাদান, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য, উৎপাদন ও প্যাকেটজাতকরণের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, মডেল বা ব্যাচ নম্বর এবং উৎপাদনকারী, মোড়কজাতকারী ও আমদানিকারকের নাম-ঠিকানাসহ বিভিন্ন তথ্য উল্লেখের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রশ্ন: অনলাইন জুয়ার ক্ষেত্রে কী শাস্তির প্রস্তাব রয়েছে?
অনলাইন জুয়া বা বেটিংয়ের আয়োজন কিংবা এতে সহায়তার জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।



