সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন এবং ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ইরানের খারগ দ্বীপ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক অভিযানের তৃতীয় সপ্তাহে এসে মার্কিন বাহিনী সরাসরি এই দ্বীপের সামরিক স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এই হামলা কেবল একটি সাধারণ সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কেন যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপটিকে তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের এই হামলার সময়, প্রেক্ষাপট, কৌশলগত কারণ এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলোর দিকে নিবিড়ভাবে দৃষ্টিপাত করতে হবে।
প্রথমেই বুঝতে হবে খারগ দ্বীপ ঠিক কোথায় অবস্থিত এবং এর কৌশলগত গুরুত্ব কতটা। ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে উপসাগরের উত্তরাংশে অবস্থিত এই ছোট দ্বীপটি মূলত দেশটির অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশেরও বেশি এই দ্বীপের সুবিশাল টার্মিনাল দিয়ে বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা হয়। এ কারণেই এই দ্বীপের ওপর যেকোনো আঘাত সরাসরি ইরানের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ডে আঘাত হানার শামিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্য অনুযায়ী, তারা এই দ্বীপে একটি বড় পরিসরের ও নিখুঁত হামলা চালিয়েছে, যেখানে ইরানের ৯০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। বিমান বিধ্বংসী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি নৌঘাঁটি এবং বিমানবন্দর সংলগ্ন স্থাপনাগুলো এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম ফারস-এর সূত্রমতে, হামলার সময় দ্বীপে অন্তত ১৫টি বিশাল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং সেখান থেকে আকাশে ঘন ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ জানিয়েছে, হামলার পরেও দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি স্বাভাবিকভাবেই চলছে।
এবার আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে: কেন আমেরিকা খারগ দ্বীপে হামলা করল? এর পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য মূলত দ্বিমুখী: প্রথমত, সামরিক পরাক্রম প্রদর্শন এবং দ্বিতীয়ত, একটি চূড়ান্ত কৌশলগত আল্টিমেটাম বা সতর্কবার্তা দেওয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা প্রদান বা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখে, তবে পরবর্তী হামলাটি সরাসরি খারগ দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোর ওপর হতে পারে। অর্থাৎ, এবারের হামলায় মার্কিন বাহিনী অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তেল শোধনাগার বা রপ্তানি অবকাঠামোগুলোকে অক্ষত রেখে কেবল সামরিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করেছে, যা মূলত তেহরানের প্রতি একটি কড়া সতর্কবার্তা। ট্রাম্প এই অভিযানকে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে “অন্যতম শক্তিশালী বোমা হামলা” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে, আপাতত তেল স্থাপনাগুলো ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিলেও, হরমুজ প্রণালিতে অবাধ ও নিরাপদ জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে তিনি মুহূর্তেই তার এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প ইরানকে অস্ত্র সমর্পণ করে দেশের যা অবশিষ্ট আছে তা বাঁচানোর পরামর্শ দিয়েছেন। সুতরাং, এই হামলার প্রধান কারণ হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানের যেকোনো পদক্ষেপকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার হুমকি দেওয়া এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি চলাচলের পথ নিজেদের শর্তে নিষ্কণ্টক রাখা।
এই হামলার পর স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, ইরান কীভাবে এর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে এবং এর বৈশ্বিক প্রভাব কী হতে পারে? তেহরান এই হামলার জবাবে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। তারা জানিয়েছে, যদি খারগ দ্বীপের তেল অবকাঠামোতে কোনো ধরনের আঘাত হানা হয়, তবে ওই অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত তেল স্থাপনা পুড়িয়ে “ছাইয়ের স্তূপ” করে দেওয়া হবে। এই ধরনের পাল্টাপাল্টি হুমকি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি “বিপর্যয়কর পরিস্থিতি” তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে, যা পুরো বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস শিল্পের জন্য এক অশনিসংকেত। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তাদের তেল স্থাপনায় হামলার আশঙ্কার বিষয়টিকে একটি তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে এবং তারা যে এতদিন সংযম দেখাচ্ছিল, মার্কিন হামলার পর সেই সংযমের অবসান ঘটতে পারে। এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতোমধ্যে ৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। জর্জিটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির একজন বিশ্লেষক জেইডন আলকিনানির মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে এবং তেল স্থাপনা ধ্বংসের মতো ঘটনা ঘটলে, এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব মাঠপর্যায়ের যুদ্ধ পরিস্থিতির চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংকট প্রশমনের কোনো লক্ষণ আপাতত দৃশ্যমান নয়। একদিকে যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরান সম্পূর্ণভাবে পরাজিত এবং তারা একটি চুক্তিতে আসতে চায়, যদিও তিনি নিজে এমন কোনো চুক্তির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরে চরম প্রতিশোধমূলক হামলার আলোচনা চলছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে ইতোমধ্যে অন্তত ১,৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮,৫৫১ জন আহত হয়েছেন। তা সত্ত্বেও, সংঘাত কমার কোনো ইঙ্গিত নেই। মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলা তেহরান, কারাজ, ইসফাহান এবং তাবরিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে আঘাত হেনেছে। এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইসরায়েলি ভূখণ্ড এবং ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ‘হায়দার’ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অত্যন্ত উন্নত সমরাস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টাহামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সামরিক প্রস্তুতি আরও জোরদার করছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ২,৫০০ নৌ সেনা (মেরিন) এবং ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’ নামক একটি উভচর আক্রমণকারী যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে। ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের এই সেনাদল উভচর অবতরণ অভিযানের পাশাপাশি দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার মতো কাজে বিশেষভাবে দক্ষ। ওয়াশিংটন থেকে বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, সেনা মোতায়েনের এই পদক্ষেপ সরাসরি কোনো স্থল অভিযানের পূর্বলক্ষণ না হলেও, এটি অন্তত এটুকু স্পষ্ট করে দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই এই যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে চাইছে না এবং ধীরে ধীরে তারা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা নিছক সামরিক পদক্ষেপ নয়; এটি মূলত হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ চেইনকে সুরক্ষিত রাখা এবং ইরানকে চূড়ান্ত সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে ফেলার একটি সুকৌশলী ভূ-রাজনৈতিক চাল। এই হামলার মাধ্যমে আমেরিকা বিশ্বকে এবং বিশেষ করে ইরানকে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে তারা যেকোনো মুহূর্তে ইরানের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অর্থনৈতিক ধমনীতে চূড়ান্ত আঘাত হানতে সক্ষম। অন্যদিকে, ইরানও তাদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ গড়ার এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থে আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে আপসের বদলে কট্টরপন্থী অবস্থানেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এই দুই পক্ষের অনড় অবস্থান এবং ক্রমাগত সামরিক উত্তেজনা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকেই নয়, বরং পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই এক গভীর সংকটের সামনে দাঁড় করিয়েছে।





