আগামী রোববার (২৩ আগস্ট) দেশে এলএনজির একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এটি পৌঁছলে দেশের সার্বিক গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। কার্গোটি মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে যুক্ত হবে। টার্মিনালটি পুরোদমে চালু হলে এখান থেকে দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এতে এক মাস ধরে চলা তীব্র গ্যাস সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নির্ধারিত সময়ে পরবর্তী এলএনজি কার্গোগুলো দেশে আনা এবং দুটি টার্মিনাল থেকেই নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুক্রবার বিকেল ৪টায় দেশে গ্যাস সরবরাহ ছিল ২২০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস ১৬২ কোটি এবং এলএনজি থেকে এসেছে মাত্র ৫৮ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে এলএনজির পুরো সরবরাহই আসছে সামিটের টার্মিনাল থেকে।
গত মাসের শেষদিকে এক্সিলারেটের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। পরে সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এর মধ্যেই নরসিংদী, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে সংকটের প্রভাব তীব্র হয়েছে। নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় ছোট-বড় শতাধিক শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাবে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। জেলার টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলগুলোর বড় অংশই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।
গাজীপুরেও অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে এক পিএসআইয়ের নিচে নেমে এসেছে। সেখানে গ্যাসনির্ভর প্রায় সাড়ে ৪০০ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২২ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে যেসব কারখানা চালু রাখা হয়েছে, সেগুলোর উৎপাদনও কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
চট্টগ্রামের শিল্পকারখানাগুলোতেও গ্যাস সংকটে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে এবং বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। গ্যাসের চাপ কম থাকায় কিছু কারখানা দুই শিফটের পরিবর্তে এক শিফটে উৎপাদন চালাচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের একাধিক ইউনিটও বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
এ অবস্থায় রোববারের কার্গো ঘিরে আশা দেখছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, কার্গোটি সময়মতো এলে খালাস শেষে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে। শুরুতে সরবরাহ কম থাকলেও ধীরে ধীরে তা বাড়িয়ে দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করা হবে।
তবে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পরবর্তী কার্গোগুলো নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানো জরুরি। দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ২২০ কোটি ঘনফুটের আশপাশে; অর্থাৎ ঘাটতি রয়ে গেছে প্রায় ১৮০ কোটি ঘনফুট।
এমন পরিস্থিতিতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহের অগ্রাধিকার দাবি করেছেন উদ্যোক্তারা। বর্তমানে বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে শিল্প খাতে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক্সিলারেট থেকে নতুন করে ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে তা থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পে গ্যাস দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ না পেলে শুধু উৎপাদন বন্ধই হবে না, বরং রপ্তানি আদেশ হাতছাড়া হওয়া, শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগ– সব ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই রোববারের কার্গো খালাসের পাশাপাশি পরবর্তী কার্গোগুলোর আসার সময়সূচিও কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
চট্টগ্রামের শিল্পকারখানায় তৈরি হচ্ছে অচলাবস্থা
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, গ্যাস সংকটে একপ্রকার অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে চট্টগ্রামের শিল্প খাতে। গ্যাসের অভাবে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ছোট-বড় অনেক শিল্পকারখানা। অনেক কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন শিল্পকারখানা মালিকরা। গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধান না হলে উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে তা প্রতিযোগী দেশগুলোর হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বায়েজিদ, অক্সিজেন ও কালুরঘাট শিল্প এলাকায় গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে অর্ধশতাধিক ছোট ও মাঝারি পোশাক, বস্ত্র, সুতা ও অ্যাক্সেসরিজ কারখানা। সবচেয়ে বেশি সংকটে গ্যাসনির্ভর নিটিং, ডাইং, প্রিন্টিংসহ কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল। গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানায়ও তার প্রভাব পড়েছে।
শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পোশাক ও বস্ত্র শিল্পের পাশাপাশি গ্যাস সংকটে বিপাকে পড়েছে রড, সিমেন্ট, খাদ্যসহ গ্যাসনির্ভর প্রায় সব ধরনের শিল্পকারখানায়। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন কমেছে প্রায় অর্ধেক। আবার কারখানা চালু রাখতে না পারায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পণ্য উৎপাদনের কাঁচামালও। ফলে সার্বিকভাবে উৎপাদনের বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গ্যাস সংকট কখন কাটবে– সুনির্দিষ্ট করে বলতেও পারছে না কেউ।


