হলিউডে তার চেয়ে আরো বেশি চেনা সুপারস্টার, মেগাস্টার আছেন। কিন্তু এমন মানুষ খুব কম, যাদের কথা শুধু অভিনয়ের জন্য নয়- বরং তাদের অবস্থান, সাহস আর মানবিকতার কারণেও বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। জাভিয়ের বারদেম সেই বিরল মানুষদের একজন!
ভালোবাসা, রাজনীতি, যুদ্ধ, নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা গণমাধ্যমের খবরদারি- যে বিষয়গুলো নিয়ে অধিকাংশ তারকা কৌশলী কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে নীরবতা বজায় রাখেন, বারদেম সেখানে খোলাখুলিভাবে কথা বলেন। কখনও স্ত্রী পেনেলোপি ক্রুজ-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে, কখনও বা যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে। আর সেই কারণেই হয়তো তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, অনেকের কাছে এক ধরনের নৈতিক অবস্থানের প্রতীক।
২০১৮ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভালে এক সাংবাদিকের যৌনতার পক্ষে যায় এমন প্রশ্নের জবাবে বারদেম বলেছিলেন, “আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত রুচিহীন।” মুহূর্তটি ভাইরাল হয়েছিল। কারণ, বিনোদন জগতের চেনা কূটনৈতিক ভাষার বাইরে গিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে অসম্মানকে অসম্মানই বলেছিলেন।

অস্কারে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’
২০২৬ সালের অস্কারে সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পুরস্কার উপস্থাপন করতে গিয়ে বারদেম বলেন, “যুদ্ধ নয়, ফিলিস্তিনে শান্তি আসুক”। এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটিই হয়ে ওঠে সেই আসরের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক বার্তাগুলোর একটি।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে বারদেমের অবস্থান অবশ্য নতুন নয়। জাতিসংঘে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি গাজায় চলমান পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। অস্কারের লালগালিচায় তিনি ‘ফিলিস্তিন’ লেখা ব্যাজ, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হান্দালা এবং ‘যুদ্ধ নয়’ লেখা পিন পরেছিলেন।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০৩ সালেও ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে একই ধরনের পিন পরেছিলেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “২৩ বছর পর আমরা আবার আরেকটি অবৈধ যুদ্ধ দেখছি।”

পুরুষতন্ত্র নিয়ে বরাবরই সরব বারদেম
চলমান কান চলচ্চিত্র উৎসবে পরিচালক রদ্রিগো সোরোগয়েন-এর মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা ‘দ্য বিলাভড’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বারদেম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন তার ‘বিষাক্ত পুরুষতন্ত্র’ বিষয়ক বক্তব্যের জন্য।
সিনেমাটিতে তিনি অভিনয় করেছেন এক বয়স্ক নির্মাতার চরিত্রে, যিনি আসক্তি ও মেয়ের সঙ্গে ভাঙা সম্পর্কের সংকটে ভুগছেন। সেই প্রসঙ্গ থেকেই বারদেম বাস্তব সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন,“গড়ে প্রতি মাসে দুইজন নারী তাদের সাবেক স্বামী বা সঙ্গীর হাতে খুন হন। এটা ভয়ংকর। আমরা কি স্বাভাবিক? কিছু পুরুষ কেন মনে করে নারীরা তাদের সম্পত্তি?”
তার মতে, এই মানসিকতাই বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতাকেন্দ্রেও কাজ করে। তিনি বলেন, “ট্রাম্প, পুতিন কিংবা নেতানিয়াহুর মতো তথাকথিত ‘পুরুষালি’ নেতাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের রাজনীতি আসলে বিষাক্ত পুরুষতন্ত্রেরই বহিঃপ্রকাশ।”
গাজা যুদ্ধ ও নীরবতার সমালোচনা
গাজা প্রসঙ্গে বারদেমের বক্তব্য আরও সরাসরি। তার ভাষায়, “এখন তরুণ প্রজন্ম নিজের ফোন ও টেলিভিশনের পর্দায় সবকিছু দেখছে। তারা বুঝতে পারছে, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কোনোভাবেই গণহত্যার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো যায় না।”
তিনি আরও বলেন, “আপনি যদি নীরব থাকেন কিংবা সমর্থন করেন, তাহলে আপনি গণহত্যার পক্ষেই দাঁড়াচ্ছেন।”
এই স্পষ্ট অবস্থানই তাকে বিশ্বের অন্য যে কোনো তারকা থেকে আলাদা করে তোলে। কারণ, যেখানে তারকা মানেই বিতর্ক এড়িয়ে চলা এক ধরনের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে, সেখানে বারদেম নিজের অবস্থান আড়াল করেন না। জনপ্রিয়তা হারানোর ভয় তার নেই, তিনি সমাজ বাস্তবতাকে স্বীকার করে সেটার মুখোমুখি হওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত থাকেন! নিজের সক্ষমতার মধ্যে যতোটা পারা যায় তিনি প্রতিরোধ করেন, না হলে অন্তত অন্যায়ের প্রতিবাদ জারি রাখেন!
গণমাধ্যম, প্রযুক্তি ও তরুণ প্রজন্ম নিয়ে উদ্বেগ
বারদেম শুধু রাজনীতি বা যুদ্ধ নয়, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির প্রভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন। তার মতে, তথ্যের জগতে একধরনের করপোরেট খবরদারি তৈরি হচ্ছে। বড় বড় মিডিয়া কোম্পানির একীভূত হওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমনির্ভর কনটেন্ট তরুণদের চিন্তার পরিসর সংকুচিত করছে।
তিনি বলেন, “দ্রুত, সরলীকৃত ও জনতুষ্টিমূলক বার্তাগুলো তরুণদের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলছে। তারা যদি তথ্য যাচাই, তুলনা ও বিশ্লেষণ করা বন্ধ করে দেয়, তাহলে সেটা খুবই বিপজ্জনক।”

ভয় পেয়েও কথা বলার সাহস
জাভিয়ের বারদেমের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই, তিনি ভয়কে অস্বীকার করেন না, কিন্তু ভয় পেয়েও কথা বলেন। তার ভাষায়,“ভয় অবশ্যই আছে। কিন্তু ভয় পেলেও কাজটা করতে হয়। আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারতে হবে। আমার মা আমাকে এভাবেই মানুষ করেছেন। এর কোনো বিকল্প নেই, আর এর পরিণতি মেনে নিতেও আমি প্রস্তুত।”
একটা সময় ছিল, যখন তারকাদের শুধু পর্দার মানুষ ভাবা হতো। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে ব্যক্তিগত অবস্থান, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে জাভিয়ের বারদেম কেবল একজন অসাধারণ অভিনেতাই নন, তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি মনে করিয়ে দেন জনপ্রিয়তা নয়, সাহসই একজন শিল্পীকে সত্যিকারের বড় করে তোলে।
হয়তো এ কারণেই পৃথিবীর আরও বেশি জাভিয়ের বারদেম দরকার। –ভোগঅদ্রিয়া






