ঋত্বিক, চলচ্চিত্র বিপ্লবীর একশো বছর | চ্যানেল আই অনলাইন

ঋত্বিক, চলচ্চিত্র বিপ্লবীর একশো বছর | চ্যানেল আই অনলাইন

“ঋত্বিক ইজ আ গ্রেট মাস্টার অব ওয়ার্ল্ড সিনেমা। ভারতের সিনেমায় যা কিছু হয়েছে, ঋত্বিক ঘটক তার থেকে অন্তত দশ বছর এগিয়ে ছিলেন।”— নবারুণ ভট্টাচার্যের এই উক্তি শুধু প্রশংসা নয়, এটি এক নির্মম সত্যের স্বীকৃতি।

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন নির্মাতা খুব কমই আছেন, যাঁর শিল্পচিন্তা সময়ের সীমারেখা অতিক্রম করেছে। আর সেই বিরল নামগুলোর শীর্ষে রয়েছেন ঋত্বিক কুমার ঘটক।

১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর, ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছিলেন জন্মগতভাবে বিদ্রোহী। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘ভবা’। কিন্তু তাঁর মনের আরেক নাম ছিল যেন ‘অস্থিরতা’! ময়মনসিংহের বিদ্যালয়জীবন থেকে রাজশাহীর পদ্মা নদী পর্যন্ত তাঁর বেড়ে ওঠা যেন এক সিনেমাটিক যাত্রা, যেখানে প্রতিটি দৃশ্যে ছিল মানুষের বেদনা, নদীর স্মৃতি, আর ছিন্নভিন্ন এক মাতৃভূমির আকুলতা।

দেশভাগ ঋত্বিকের ভেতরটা ছিঁড়ে দিয়েছিল। ১৯৪৭ সালের সেই বিভক্তি শুধু ভূখণ্ডের ছিল না, ছিল আত্মারও। তিনি বলতেন, “পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে নিজের দেশে আসা মানে নিজের মা’য়ের কোলে যাওয়ার আগে অনুমতি চাওয়া।” তাই স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম না নেওয়া পর্যন্ত তিনি কখনো আসেননি এই মাটিতে, যেখানে তাঁর জন্ম।

১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ভাষা দিবসের দিন অবশেষে তিনি ফিরেছিলেন। কিন্তু ফিরে এসেছিলেন এক ধ্বংসস্তূপে — বোন প্রতীতি দেবীর চোখে তখনও শুকোয়নি যুদ্ধের আগুন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পুত্রবধূ ছিলেন প্রতীতি, যিনি ১৯৭১-এ হারিয়েছিলেন শ্বশুরকে, হারিয়েছিলেন সংসার। এই বিধ্বস্ত দৃশ্য ঋত্বিককে যেন চূর্ণ করে দিয়েছিল।

তবু সৃষ্টিশীলতার আগুন নিভে যায়নি তাঁর ভেতরে। সেই ভস্মীভূত ঘরে প্রতীতি তাঁর হাতে তুলে দেন অর্ধদগ্ধ এক পাণ্ডুলিপি — অদ্বৈত মল্ল বর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। আর সেই রাতে, বোনের সাদা শাড়িকে খাতা বানিয়ে ঋত্বিক লিখে ফেলেছিলেন সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্ত নদীর চিত্রনাট্য!

এই মানুষটি ছিলেন সিনেমার ভাষায় কবি, যিনি রক্ত আর নদীর প্রবাহে খুঁজেছেন মানুষকে। তাঁর চলচ্চিত্র মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখা থেকে তিতাস একটি নদীর নাম- কেবল ছবি নয়, সময়ের সাক্ষ্যপত্র। সেখানে দেশভাগের যন্ত্রণা যেমন আছে, তেমনি আছে মানুষের বেঁচে থাকার জেদ, প্রতিরোধ, প্রেম, ও হারানোর বেদনা।

নবারুণ ভট্টাচার্য তাই নিঃসঙ্কোচে বলেছিলেন-“ঋত্বিক দশ বছর এগিয়ে ছিলেন ভারতীয় সিনেমা থেকে!” আসলে ঋত্বিক ছিলেন এমন এক নির্মাতা, যিনি ‘সময়’-এর হাত ধরেননি; বরং সময়ই তাঁকে ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল।

আজ তাঁর জন্মের একশ বছর পূর্ণ হচ্ছে। তবু তাঁর সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম, প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি চিৎকার— আজও ততটাই প্রাসঙ্গিক, ততটাই তীক্ষ্ণ। কারণ ঋত্বিক ঘটক শুধু সিনেমা নির্মাণ করেননি, তিনি ইতিহাসকে পর্দায় অনুবাদ করেছিলেন।

ঋত্বিকের পরিচালনায় সিনেমাগুলি:

• নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭)
• অযান্ত্রিক (১৯৫৮)
• বাড়ি থেকে পালিয়ে(১৯৫৮)
• মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)
• কোমল গান্ধার (১৯৬১)
• সুবর্ণরেখা (১৯৬২)
• তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)
• যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭)

Scroll to Top