১০১-এ ঋত্বিক

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল নাম ঋত্বিক ঘটক। নির্মাণশৈলী, গল্প বলার ধরন ও বিষয়বৈচিত্র্যে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজস্ব এক চলচ্চিত্রভাষা। দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবন, মানুষের সংকট থেকে শুরু করে সমাজ ও রাজনীতির নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে তার সিনেমায়। জীবদ্দশায় প্রাপ্য স্বীকৃতি খুব বেশি না পেলেও সময়ের সঙ্গে তার চলচ্চিত্রের গুরুত্ব ও আবেদন বেড়েছে। কিংবদন্তি এই নির্মাতার ১০১ তম জন্মদিনে উল্লেখযোগ্য সাতটি সিনেমা নিয়ে এই আয়োজন।
১. মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)
ঋত্বিক ঘটকের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রশংসিত সিনেমাগুলোর একটি ‘মেঘে ঢাকা তারা’। শক্তিপদ রাজগুরুর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটির চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন ঋত্বিক নিজেই। দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা এবং পরিবারের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা নীতা চরিত্রের করুণ পরিণতি ছবিটির মূল উপজীব্য। নীতা চরিত্রে সুপ্রিয়া চৌধুরীর অভিনয় আজও দর্শকের মনে গভীর দাগ কাটে।
২. কোমল গান্ধার (১৯৬১)
‘কোমল গান্ধার’ সিনেমায় ব্যক্তিগত প্রেম, ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (আইপিটিএ) বিভক্ত নেতৃত্ব এবং দেশভাগের পরিণতি একসূত্রে গেঁথেছেন ঋত্বিক। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ভৃগু ও অনসূয়ার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। ঋত্বিকের অন্য অনেক ছবির তুলনায় এর আবহ কিছুটা আশাবাদী। বাণিজ্যিকভাবে সফল না হলেও ছবিটি তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত।
৩. অযান্ত্রিক (১৯৫৮)
ভারতীয় চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের বিজ্ঞান কল্পকাহিনিনির্ভর সিনেমাগুলোর একটি হিসেবে ‘অযান্ত্রিক’ বিশেষভাবে আলোচিত। ছবির গল্প এক দরিদ্র ট্যাক্সিচালক ও তার গাড়িকে ঘিরে। চালক গাড়িটিকে প্রায় জীবন্ত সঙ্গী হিসেবেই দেখে। জড়বস্তুকে কেন্দ্র করে এমন অভিনব গল্প বলার ধরন সে সময়ের ভারতীয় চলচ্চিত্রে ছিল ব্যতিক্রমী। এটি ছিল পরিচালক হিসেবে ঋত্বিকের প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র। ১৯৫৯ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবেও ছবিটি প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল।
৪. সুবর্ণরেখা (১৯৬৫)
দেশভাগের প্রভাব নিয়ে নির্মিত ঋত্বিকের চলচ্চিত্র-ত্রয়ীর শেষ ছবি ‘সুবর্ণরেখা’। পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেওয়া তিন উদ্বাস্তুর জীবনকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে এর গল্প। চরিত্রগুলো হলো এক হিন্দু যুবক, তার ছোট বোন এবং নিম্নবর্ণের এক বালক। ১৯৬২ সালে ছবিটির নির্মাণ শেষ হলেও মুক্তি পায় ১৯৬৫ সালে। ১৯৯৮ সালে এশিয়ার একটি চলচ্চিত্র সাময়িকীর সমালোচকদের জরিপে সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের তালিকায় ১১তম স্থান পেয়েছিল ছবিটি।
৫. তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)
বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের তিতাস নদী ও তার তীরের জেলেজীবন নিয়ে নির্মিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ছবিটিতে একাধিক চরিত্র ও পরস্পরসংযুক্ত গল্পের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে একটি জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি ও সংকট। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসেও ছবিটির গুরুত্ব বিশেষ। ২০০৭ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট এটিকে সর্বকালের সেরা বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
৬. যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৪)
ঋত্বিক ঘটকের শেষ চলচ্চিত্র ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র নীলকণ্ঠ বাগচী, একজন বুদ্ধিজীবী, যিনি সংসার ছেড়ে গ্রামবাংলার পথে বেরিয়ে পড়েন। চরিত্রটিতে অভিনয়ও করেছেন ঋত্বিক নিজেই। পথে নানা মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়, তাদের গল্পের মধ্য দিয়ে উঠে আসে সমাজ, রাজনীতি ও সময়ের নানা সংকট। ছবিটিতে বাংলায় নকশাল আন্দোলনের শুরুর সময়ের কিছু চিত্রও দেখা যায়। অভিনব চিত্রগ্রহণ ও আত্মজৈবনিক উপাদানের কারণে ছবিটি ঋত্বিকের চলচ্চিত্রভুবনে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
৭. বাড়ি থেকে পালিয়ে (১৯৫৮)
আট বছর বয়সী এক শিশুর বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় পালিয়ে যাওয়ার গল্প ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’। বাবাকে কঠোর ও ভীতিকর মনে করা শিশুটি কল্পনার শহর কলকাতায় গিয়ে মুখোমুখি হয় বড় শহরের বাস্তবতার। গ্রাম ও নগর, শৈশবের কল্পনা এবং জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা ছবিটিতে উঠে এসেছে শিশুটির চোখ দিয়ে। ঋত্বিক ঘটক যে গ্রামীণ ও নাগরিক, দুই ধরনের জীবনকেই সমান দক্ষতায় পর্দায় তুলে ধরতে পারতেন, ছবিটি তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
