দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা। যার চারদিকে পানি আর পানি। তারই মাঝখানে ছোট্ট একটা দ্বীপ সেটা হলো গাবুরা। কিন্তু তার চারদিকে পানি থাকলেও সংকট রয়েছে সুপেয় পানির। লোনা পানিতে যেন উপকূলের মানুষের জীবনটাই যেন লোনা হয়ে গেছে। তাই তো বলে লবণ জলে জীবন জ্বলে। পানি যখন সুপেয় না হয়, তখন তা হয়ে ওঠে নানা অসুখ, নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যা ও মৃত্যুর কারণ।
গাবুরার ইউনিয়নের গ্রাম গুলোতে গেলে সর্বত্র পানি সংকটের এমন চিত্র চোখে পড়ে। এ যেন পানির দেশের পানি থাকার পর ও হাকাকারের লম্বা লাইন। উপকূলে এক কলসি পানি সংগ্রহের জন্য নারী-পুরুষ আর শিশুদের ছুটতে হয় সেই সকাল থেকে। কেউ কেউ গ্রামের মাইলের পর মাইল হেঁটে পানি আনতে হয় আবার কেউ কেউ নৌকা বেয়ে পানি আনতে আসছে। আবার দেখা যায় স্কুল বাদ দিয়ে শিশুদের ও ছুটতে হচ্ছে পানি আনার জন্য। উপায় নেই পানি থেকে ও এটাই উপকূল জীবন। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের পানি পান করাসহ দৈনন্দিন কাজের জন্য সম্পূর্ণরূপে নির্ভর হতে হয় পুকুর ও বৃষ্টির পানির ওপর।
তবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনিয়ন্ত্রিত চিংড়ি চাষ, চিংড়ি ঘেরে উঁচু বাঁধ না দেয়া, নদী প্রবাহ আটকে দেয়া, পুকুর ভরাট, খাল বেদখলের কারণে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষগুলো নিরাপদ পানির তীব্র সংকটের মধ্যে দিয়ে দিন পার করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সাধারণত শীতের মৌসুম থেকে বর্ষা আসার আগ পর্যন্ত একটা লম্বা সময় এই দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় এ উপকূলবাসীর।

শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপেজেলায় ১ হাজার ৯৪৯ গভীর, ৪৯১ টি অগভীর, ৫০০টি এসএসটি ও ৪৪১টি ভি এস টি নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে আটটি গভীর, ১২৯টি অগভীর, ১৬টি এসএসটি ও ৪৪টি ভিএসএসটি নলকূপ কয়েক বছর ধরে অকেজো পড়ে আছে।
গাবুরা এলাকার বাসিন্দা মোশারফ গাজী বলেন, এক কলস পানির জন্য মানুষ দুই-তিন ঘণ্টা প্রচন্ড রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। তারা ৩/৪ কিলোমিটার দূর থেকে এসে জয়াখালী মোড় সংলগ্ন আকিজ কোম্পানির তৈরি পানির ফিল্টার থেকে পানি নেওয়ার জন্য।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া পারভীন বার্তা২৪.কম’কে জানান, ‘আমাদের বাড়ি সাপখালি যা এখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে সকাল সাতটার দিকে পানি নিতে এসেছি আমি এবং আমার এলাকার চাচিরা। আমার স্কুল দশটা থেকে এখান থেকে যেয়ে স্কুল ধরতে পারবো কিনা সেটাও জানিনা। এখন বাজে নয়টা।’
স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়ে কেন পানি নিতে এসেছো এমন প্রশ্নে সুমাইয়া বলেন, আমরা গরীব মানুষ বাবা জোন (দিনমজুর) দিতে গেছে। বাবা কাজ না করলে খাব কি? মা বাড়িতে কাজ করছে। এজন্য আমি এসেছি পানি নিতে। প্রতিদিন পানির জন্য এই পথ পাড়ি দিতে হয় আমার। খুব কষ্ট হয় তারপরও পানি তো খেতে হবে।
এ অবস্থা শুধু গাবুরা ইউনিয়নে নয়, পার্শ্ববর্তী রমজাননগর, ঈশ্বরীপুর, বুড়িগোয়ালিনী, কৈখালি, পদ্মপুকুরসহ গোটা উপকূলে একই অবস্থা বলে জানান স্থানীয়রা।

পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করতে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে এসেছেন বৃদ্ধা আমেনা বেগম। তিনি বার্তা২৪.কম’কে বলেন, ‘সামনের বর্ষা সময় পর্যন্ত এভাবেই পানি টেনে আমাগো খাইতেবে’।
পানি নিতে আসা নারী ও শিশুরা জানায়, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে সময় অপচয়ের পাশাপাশি তাদের প্রচণ্ড রকমের কষ্ট হয়। তবে খাওয়ার উপযোগী পানি নিয়ে এমন কষ্ট কেবলমাত্র দেওল আর তৎসংলগ্ন পাটনীপুকুর, শংকরকাঠি, কাঠালবাড়িয়া এলাকায় নয়, শ্যামনগর উপজেলার রমজান নগর, কৈখালী, গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, কাঁচড়াহাটিসহ উপজেলার প্রায় সর্বত্র এমনই পরিস্থিতি। তাপদাহ বাড়ালে খাওয়ার পানির সংকট আরও বাড়বে বলে জানান তারা।
ঝাপা গ্রামের অনিল কৃষ্ণ মন্ডল জানান, আমি নদী পার হয়ে নৌকা নিয়ে এসেছি পানি নিতে। আমাদের এলাকায় খাবার পানি উৎস নেই। অন্যান্য পুকুরের লবন পানি খায়ে কোন রকম জীবন বাঁচায়। আমি আমার পরিবারের জন্য দশটি ৩০ লিটারের ড্রাম নিয়ে পানি নিতে এসেছি। ১৫০ টাকা দাম নেয় এই পানির। এই ১৫০ টাকার পানি চার থেকে পাঁচ দিন চলবে। এভাবেই ইনকামের অধিকাংশ টাকায় চলে যায় পানি কিনতে।
পানির প্লান্ট এর দেখভালকারী সুনীল কৃষ্ণ বৈদ্য জানান, এখান থেকে পদ্মপুকুর, ঝাপা, দুর্গাবাটি, আড়পাঙ্গাশিয়া, হেন্সি, বুড়িগোয়ালিনী সহ পার্শ্ববর্তী অনেক এলাকার মানুষ পানি নিয়ে যায়। প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার লেটার পানি বিক্রি হয়। গরম করলে আরো বাড়বে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, গ্রীষ্মের তাপদাহ বাড়ার সাথে সাথে এই উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করবে উল্লেখ করে তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে পানির ব্যবস্থা না করলে এখানকার মানুষ তীব্র পানি সংকটে পড়বে। এতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

তবে তিনি এর একটি স্থায়ী সমাধান এবং এই জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সরকার ও সকল উন্নয়ন সংস্থার একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ নলকূপে পানি কম উঠছে। শুধুমাত্র দুর্যোগকালীন সময়ে সরকারিভাবে দুর্গতদের মধ্যে খাওয়ার পানি বিতরণ করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, পানি সমস্যা দূরীকরণে শ্যামনগরে জনস্বাস্থ্য বিভাগের পিএসএফ, আরডব্লিউএইচ (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং), গভীর ও অগভীর নলকূপ, আরও (রিভার্স অসমোসিস), পুকুর, দিঘি, মার (ম্যানেজ একুইফার রিসার্চ) মিলিয়ে প্রায় ৮ হাজার পানির উৎস রয়েছে। তবে বৃষ্টির অভাব, বন্যায় এলাকায় লবণ পানি ঢুকে যাওয়ায় ও পুকুর, জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় আরডব্লিউএইচ ও পিএসএফ ঠিকভাবে কাজ করছে না। ফলে পানির সংকট বেড়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, কিছু এনজিও পানি সরবরাহের কাজ করলেও জনস্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় না করায় তাদের পানি সরবরাহের বিষয়ে কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।



