ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ একাধিক শিল্প ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। প্রভাব পড়েছে লাইফস্টাইলের সঙ্গে যুক্ত শিল্প ক্ষেত্রেও। এই তালিকায় রয়েছে কনডমের মতো পণ্য রয়েছে।
শনিবার (৮ এপ্রিল) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলা এই তথ্য জানায়।
কনডম উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত পেট্রো-কেমিক্যাল পণ্য, অ্যামোনিয়া ও সিলিকন অয়েলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দাম বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। খুচরা বিক্রিতেও প্রভাব পড়েছে।
কনডম উৎপাদন শিল্পের সূত্রগুলো বলছে, ভারতের আট হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে অ্যামোনিয়ার দাম ৪০-৫০% শতাংশ বাড়তে পারে। যে কারণে সিলিকন তেলের দামও বাড়তে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “কেউ ভাবেনি যে এই ইন্ডাস্ট্রিতে কোনো সমস্যা হবে। তবে কনডম এখন লাইফস্টাইল প্রোডাক্টে পরিণত হয়েছে এবং এই ব্যবসার যে কোনোরকম প্রভাব মানুষের উপরেও পড়ে।”
ল্যাটেক্সকে স্থিতিশীল করতে এবং অতিরিক্ত প্রোটিন সরিয়ে ফেলতে অ্যামোনিয়া ব্যবহার করা হয়। কনডমের ওপরে সিলিকন অয়েলের আস্তরণ থাকে, যেটি লুব্রিক্যান্ট হিসাবে কাজ করে।
ল্যাটেক্স হলো দুধের মতো সাদা একটি তরল, যা প্রাকৃতিকভাবেও নিষ্কাশিত হয় অথবা পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক পলিমারাইজেশনের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবেও তৈরি করা হয়। এর উচ্চ স্থিতিস্থাপকতা এবং প্রসারণ ক্ষমতা রয়েছে। একইসঙ্গে এটা জলরোধী।
ল্যাটেক্স প্রাকৃতিক রাবার পণ্য, ফোম ম্যাট্রেস, দস্তানা, রঙ, পোশাক এবং আঠা ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
তবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া এবং তার ফলে খুচরো বিক্রির উপর এর প্রভাব এই প্রসঙ্গে একমাত্র উদ্বেগের কারণ নয়।
যারা জনসংখ্যা এবং পরিবার পরিকল্পনা এবং এইডস নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের মতো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত, তাদেরও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি।
‘পপুলেশন ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার’ নির্বাহী পরিচালক পুনম মুতরেজা বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুফল পেতে হলে মানুষের কাছে গর্ভনিরোধক পৌঁছনোর ব্যবস্থা মজবুত করতে হবে আর গর্ভনিরোধনে যে পুরুষদেরও দায়িত্ব আছে, সেটাও স্বাভাবিক করে তোলা দরকার।
“তাই কনডমের ঘাটতি বা দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে কিশোরী অবস্থায় গর্ভবতী হয়ে পড়ার ঘটনা বেড়ে যেতে পারে,” বলছিলেন পুনম মুতরেজা।
কেন দাম বাড়তে পারে?
এইচএলএল লাইফ কেয়ার লিমিটেডের এক মুখপাত্র বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “পিভিসি ফয়েল, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, পলি কেমিক্যাল এবং প্যাকেজিং উপকরণের মতো মূল উপাদানের দাম ওঠানামার সঙ্গেই কাঁচামাল সরবরাহ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে উৎপাদন এবং অর্ডার অনুযায়ী পণ্য পৌঁছনোর কাজও প্রভাবিত হতে পারে।”
এইচএলএল-এর সদর দফতর কেরালার তিরুবনন্তপুরমে। এটা ৬০ বছরের পুরানো সংস্থা যা কেন্দ্র সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল দেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে মাথায় রেখে।
কেরালায় প্রচুর রাবার বাগান রয়েছে। সেই কারণে এই সংস্থা কেরালাতেই প্রতিষ্ঠা করা হয়। গত কয়েক বছরে সাত জায়গায় এইচএলএল-এর উৎপাদন কেন্দ্র ছড়িয়ে পড়েছে।
সংস্থাটি এখন কনডম, হাসপাতালে ব্যবহৃত নানা জিনিষ আর ওষুধ উৎপাদন করে। এইচএলএল-এর প্রধান লক্ষ্য দেশের নারীদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো।
রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থা এখন প্রতি বছর প্রায় ২০০কোটি কনডম তৈরি করে। সংখ্যাটা দেশে তৈরি মোট কনডমের প্রায় ৫০ শতাংশ।
এইচএলএল ২০২৫-২০২৬ সালে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি এবং জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির জন্য বিনামূল্যে ১০০ কোটি ভারতীয় টাকারও বেশি মূল্যের কনডম সরবরাহ করেছিল। এইচএলএল ৮৭টার বেশি দেশে তাদের তৈরি এই পণ্য রফতানি করে।
যুদ্ধের জন্য এই শিল্প ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে তার প্রধান কারণ হলো বিতরণ এবং লজিস্টিকসের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা।
এক কর্মকর্তা বলেন, “জাহাজের কন্টেনারের বৈশ্বিক সংকটের কারণে বিদেশে ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠাতে দেরি হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বড় জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় সমুদ্র পথে পরিবহনে বেশি সময় লাগছে।”
সমস্যা রফতানিতেও
‘কেপ অফ গুড হোপ’ দিয়ে জাহাজ পাঠাতে আরো ১৫-২০ দিন সময় লাগছে। মধ্যপ্রাচ্যে আকাশসীমায় বিধিনিষেধের কারণে বিমানে মাল বহনের পরিমাণ কমেছে। যার ফলে তৈরি হয়ে যাওয়া কন্সাইনমেন্টের স্তূপ বেড়েছে।”
এই শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে কাঁচামাল সরবরাহে ঘাটতির সঠিক অনুমান করা কঠিন। এদিকে অনিশ্চয়তাও রয়েছে। একদিকে উপাদানের সমস্যা আছে, আবার তার খরচও বেড়েছে। একইসঙ্গে বিতরণের ক্ষেত্রে বাধা- এই সব কিছু মিলিয়ে স্পষ্টতই সরবরাহের উপর প্রভাব পড়বে।
মহারাষ্ট্রের মালেগাঁওয়ে অবস্থিত কিউপিড লিমিটেডও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
কিউপিড লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার আর বাবু বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “সিলিকন অয়েল ও অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের দাম নিয়ন্ত্রণে নেই। সাধারণত, এই সময়ের মধ্যে ল্যাটেক্সের দামও বেড়ে যাচ্ছে।
“উৎপাদন খরচের উপর এর প্রভাব পড়ছে। সমস্যা হলো আমরা বর্ধিত দামের বোঝা বিক্রেতাদের ওপরে চাপিয়ে দিতে পারি না। কারণ তারা এর জন্য প্রস্তুত নয়। সুতরাং এটা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে,” বলছিলেন মি. বাবু।
তিনি আরও বলেন “আমরা আমাদের উৎপাদনের ৮০ শতাংশ প্রধানত রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউরোপ এবং ব্রাজিলে রফতানি করি। এই সমস্ত জায়গায় পণ্য সরবরাহের জন্য জাহাজ পেতেও আমাদের সমস্যা হচ্ছে।”
ওষুধ শিল্পেও উদ্বেগ
কনডম শিল্পে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, একই অনিশ্চয়তা ওষুধ শিল্পেও দেখা যাচ্ছে। মূলত দুই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে এই শিল্পকে ।
ইন্ডিয়ান ড্রাগ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএমএ) মুখপাত্র বিরঞ্চি শাহ বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “একটা চ্যালেঞ্জ তো রয়েছে রফতানির ক্ষেত্রে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মতো দেশগুলোতে রফতানির জন্য জাহাজ পাওয়া নিয়ে একটা মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। তা সে সমুদ্রপথে হোক বা আকাশপথে। এর প্রধান কারণ হলো পরিবহন পেতে সময় বেশি লাগছে, তাই খরচও বেড়েছে।”
মি. শাহের কথায়, “এই বিষয়টা এখন নজরে রাখা দরকার। এর প্রভাবও স্পষ্ট। তবে ভারতে ওষুধের সহজলভ্যতা বা ওষুধ রফতানির ক্ষেত্রে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই।”
কিন্তু এমন অনেক ওষুধ রয়েছে যার কাঁচামাল পেট্রোকেমিক্যালের উপর নির্ভরশীল, যেমন সলভেন্ট (দ্রাবক) বা সিন্থেটিক ড্রাগ।
তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে বেশ জল্পনা-কল্পনা চলছে। ঘাটতি (যে সমস্ত ওষুধের উপাদান পেট্রোকেমিক্যালের উপর নির্ভরশীল) নিয়েও জল্পনা রয়েছে যে কারণে দাম বাড়ছে। তবে এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে ঘাটতির চেয়ে বেশি জল্পনা-কল্পনাই চলছে।”
“ভয়ের পরিবেশ বিরাজ করছে। আসলে মানুষ নিশ্চিত নয় কাল কী হতে চলেছে,” বলছিলেন শাহ।
কনডম শিল্পের ওপরে প্রভাব কতটা মারাত্মক?
পরিবার পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্তরা কনডমের দাম বেড়ে যাওয়া বা তার উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন।
পুনম মুতরেজা বলেন, “ভারতকে গর্ভনিরোধকের বিকল্প ব্যবস্থার প্রসার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কনডমের ব্যবহার বাড়াতে এবং পরিবার পরিকল্পনায় পুরুষদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।”
“এর দাম বাড়লে বা সরবরাহ বাধা পেলে কনডমের ব্যবহার কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে- বিশেষত তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে। এর ফলে এখনো পর্যন্ত যেটুকু সাফল্য অর্জন করা গিয়েছে তাতে ক্ষতি হতে পারে।”
তিনি বলেন, “এটা শুধুমাত্র অবাঞ্ছিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে না নারীদের উপর গর্ভাবস্থার যে অসম বোঝা থাকে, তাও বেড়ে যায়, যে সমস্যার মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে ভারত।”
ভারতে কনডমের ব্যবহার ‘বেশ কম’। পরিবার পরিকল্পনা আরো ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত করে তোলার পদ্ধতি হিসাবে এর ব্যবহার বাড়ানো দরকার।
পুনম মুতরেজার কথায়, “ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (এনএফএইচএস) -৫ থেকে জানা গিয়েছে যে বর্তমানে মাত্র নয় শতাংশ বিবাহিত দম্পতি কনডমকে তাদের পরিবার পরিকল্পনার প্রধান উপায় হিসাবে বিবেচনা করে। যা থেকে কনডমের গুরুত্ব বোঝা যায় এবং একইসঙ্গে এর ব্যবহারের প্রসার ঘটানোর যে সুযোগ আছে, তাও স্পষ্ট হয়।”
পুনম মুতরেজা বলেন, “অনেক তরুণ কনডম ব্যবহার করে।
“ভারতের মতো দেশে, যেখানে জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির একটা বড় অংশ নির্ভর করে কিনে ব্যবহার করার ওপরে, সেখানে কনডমের যদি স্বল্পমেয়াদী ঘাটতিও হয়, তাহলে এমন লোকদের কাছে তা পৌঁছবে না, যারা বিনামূল্যের বা ভর্তুকিযুক্ত কনডমের উপর নির্ভর করেন,” বলছিলেন মিজ. মুতরেজা।
সব শেষে যে প্রশ্নটা থেকে যায়, তাহলো ক্রেতাদের কি কনডমের জন্য বাড়তি দাম দিতে হবে?
শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিচ্ছে। তাদের একজন বলছিলেন, “এই যুদ্ধ যত তাড়াতাড়ি শেষ হবে, ততই সবার জন্য ভাল হবে।”



