ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক

ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ
পর্যায়ের বৈঠক

নানা সংশয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের গত ৪৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে প্রথম দফায় আলোচনা শেষ হয়েছে। গতকাল শনিবার প্রথম দফায় আলোচনা শেষে দুই পক্ষ আলোচনা হওয়া বিষয়গুলো নিয়ে লিখিত নথি বিনিময় করেছেন। বৈঠকে লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলা, হরমুজ প্রণালি পরিস্থিতি, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় দেওয়ার প্রসঙ্গসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে। আলোচনার মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান আজ রোববারও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি হোটেলে গতকাল দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি এ আলোচনা শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের

এটাই প্রথম সরাসরি আলোচনা। গতকাল রাত একটায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছিল। তখন আলোচনা ষষ্ঠ ঘণ্টায় গড়িয়েছে। আজ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে কি না, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোনো পক্ষ থেকে জানা যায়নি।

প্রায় ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের পর সাময়িক যুদ্ধবিরতি, লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলা, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত না হওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে এ আলোচনা নিয়ে সংশয় ছিল। শুরুতে এমন কথা ছিল, আলোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা আলাদা কক্ষে বসে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বার্তা আদান–প্রদান করবেন। তবে শেষ পর্যন্ত সামনাসামনি বসে আলোচনা করেন দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা। যেটাকে একধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো আবাস আসলানি বলেন, এ আলোচনাই শেষ নয়; বরং এটা একটা প্রক্রিয়ার শুরু। যদিও গত কয়েক দিনে দুই পক্ষের কথাবার্তায় এটা স্পষ্ট যে এই পথ বন্ধুর, তবে তা বন্ধ নয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা শুরু করে। জবাবে ইসরায়েলসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা শুরু করে ইরান। একই সঙ্গে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয় তেহরান। এতে প্রায় সারা বিশ্বে জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা শুরু হয়। এতে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়।

এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এরপর ইরানও যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করে। এর ধারাবাহিকতায় যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করতে গতকাল ইসলামাবাদে আলোচনায় বসে দুই পক্ষ।

প্রথম দফায় আলোচনার পর নথি বিনিময়

প্রথম দফায় আলোচনার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলো নিয়ে লিখিত নথি বিনিময় করে। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে আল–জাজিরা এ কথা জানিয়েছে। প্রথম দফায় লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলা, হরমুজ প্রণালি পরিস্থিতি, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় দেওয়ার প্রসঙ্গসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিলে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক মতভেদ উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র এ প্রণালি ঘিরে অতিরিক্ত দাবি চাপিয়ে দিতে চাইছে।

আলোচনা শুরুর প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর নৈশভোজের বিরতি দেওয়া হয়। এরপর আবার আলোচনা শুরু হয়। সূত্রের বরাত দিয়ে আল-জাজিরা বলছে, ইতিমধ্যে অনেক বিষয় আলোচনায় এসেছে। লেবাননে যা ঘটছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তেহরানের সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়তে হচ্ছে, এমন কিছু কথাও হয়েছে। তবে রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে। ধীরে ধীরে তথ্য আসছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা খুব কঠিন। কী ঘটে, তা দেখতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের প্রধান ও দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। গতকাল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে

আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা।

সরাসরি আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করে হোয়াইট হাউস জানায়, জেডি ভ্যান্সসহ মার্কিন প্রতিনিধিরা ইরানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সামনাসামনি বসে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।

আলোচনায় ইরানের নেতৃত্ব দেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান আলী আকবর আহমাদিয়ান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুল নাসের হেমমাতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা।

পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোদি আলোচনার সফলতা বা ব্যর্থতা সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্তে না পৌঁছাতে সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, কূটনীতি একটি প্রক্রিয়া। যাঁরা মনে করেন, প্রক্রিয়াটি দ্রুত কিছু ফল দেবে, তাঁরা ভুল করছেন। এখন এই আলোচনাকে সফল বা ব্যর্থ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

এদিকে সরাসরি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরও উপস্থিত ছিলেন।

দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনার আগে গতকাল তাঁরা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বসেন। এ সময় দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রাজা নকভি উপস্থিত ছিলেন।

পৃথক বৈঠক শেষে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, উভয় প্রতিনিধিদল গঠনমূলক আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এ আলোচনা টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি সুযোগ হিসেবে কাজ করবে।

আলোচনা কত দিন চলতে পারে

আলোচনা কত দিন চলবে, তা নিয়ে কোনো পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কিছু জানানো হয়নি। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে দুই দিনের আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদিও ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে এক দিন আলোচনা হবে। এদিনের আলোচনার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেবে ইরান।

ইসলামাবাদে আলোচনার মধ্যেও দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা নানা ধরনের মন্তব্য করছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গতকাল ট্রুথ সোশ্যালে বলেন, কিছু সংবাদমাধ্যমের দাবি, ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আসল কথা হলো, সবাই জানে যে তারা (ইরান) হারছে এবং ব্যাপকভাবে হারছে!

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তাদের দুটি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে।

তবে ইরান বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো জাহাজ অতিক্রম করেনি এবং সেখানে মাইন অপসারণের কোনো কার্যক্রমও নেই।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক্স বার্তায় বলেন, ‘জনগণের প্রতি আমাদের সেবা একমুহূর্তের জন্যও থামবে না। আলোচনার ফলাফল যা–ই হোক না কেন, সরকার জনগণের পাশে থাকবে। …ইসলামাবাদে ইরানের প্রতিনিধিদল দেশের স্বার্থ রক্ষায় বীরত্বের সঙ্গে আলোচনা করবে।’

এ আলোচনা চলার মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরান ও এর মিত্রদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হয়নি।

লেবাননে হামলা চলছে

এদিকে গতকালও লেবাননে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩ সদস্যসহ ১১ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে তীব্র হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এতে এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

গতকাল হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা সেখানে ও ইসরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলার কথা জানিয়েছেন।

ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে আগামী মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে আলাদা করে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

ইসলামাবাদ আলোচনায় বড় প্রসঙ্গে হিসেবে রয়েছে লেবানন। এ বিষয়ে মিডল ইস্ট আইয়ে এক বিশ্লেষণে ইরান বংশোদ্ভূত কানাডার রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহির শাহিদ সালেস লেখেন, স্থায়ী কোনো শান্তি সম্ভব কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখন ট্রাম্পই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করাই হলো আসল পরীক্ষা। যদি ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়, তাহলে যুদ্ধবিরতি টিকে থাকার সম্ভাবনা খুব কম।

Scroll to Top