মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক অবরোধের জেরে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তেলের দাম এবং সরবরাহের চিত্রে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে।
কীভাবে এই পরিবর্তন ঘটল এবং এর পেছনের পরিসংখ্যানগুলো ঠিক কী নির্দেশ করে, তারই বিশ্লেষণ এই প্রতিবেদনে।
ব্যারেলপ্রতি দাম ১২০ ডলার ছুঁইছুঁই
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। মার্চ মাসের শেষ নাগাদ এই দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বর্তমানে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই পথটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক উৎপাদনকারী দেশকে বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমাতে হয়েছে। জাহাজ কোম্পানিগুলোকে এখন বাধ্য হয়ে দীর্ঘতর ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথের সন্ধান করতে হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনের ভাড়া এবং বিমা খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যের ওপর।
সংকটের মধ্যেই ইরানের রেকর্ড রপ্তানি
একদিকে যখন পুরো বিশ্ব জ্বালানি সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে ইরান এই পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেদের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। তুরস্কভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির তথ্য এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ট্র্যাকিং ডেটা বিশ্লেষণ করে এক বিস্ময়কর চিত্র পাওয়া যায়। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ইরানের তেল রপ্তানিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করত। কিন্তু মার্চের শেষ নাগাদ, যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই তারা এই পরিমাণ বাড়িয়ে প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করেছে। অর্থাৎ, পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যেও তারা চীনের মতো বৃহৎ বাজারগুলোতে আগের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি তেল পৌঁছে দিচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির ৪৭ বনাম মার্চের ১২০ ডলার: প্রকৃত চিত্র কী?
দামের ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি ও মার্চের যে পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বিশ্ববাজারে মার্চে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছানোর তথ্যটি সম্পূর্ণ নির্ভুল। এটি আন্তর্জাতিক বাজারের বেঞ্চমার্ক বা মানদণ্ড।
তবে, ২৭ ফেব্রুয়ারিতে ইরানের তেল ৪৭ ডলারে বিক্রি হওয়ার যে তথ্যটি রয়েছে, সেটি আন্তর্জাতিক বাজারের সাধারণ চিত্র নয়। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের স্বাভাবিক দাম ছিল ৬৫ থেকে ৭০ ডলারের মধ্যে। যেহেতু ইরানের ওপর নানা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই তারা বাজার ধরে রাখতে এবং ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে অনেক সময় ব্যাপক ছাড়ে (ডিসকাউন্ট) ‘শ্যাডো মার্কেট’ বা ছায়া বাজারে তেল বিক্রি করে থাকে। ৪৭ ডলারের এই দামটি মূলত সেই বিশাল ছাড়যুক্ত নির্দিষ্ট কোনো চুক্তির মূল্য হতে পারে, যা সে সময়ের বৈশ্বিক গড় মূল্যের চেয়ে অনেক কম।
সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট। হরমুজ প্রণালির ভূরাজনৈতিক সংকট বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়ে তেলের দাম যখন ১২০ ডলারে তুলে দিয়েছে, ঠিক সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের রপ্তানি রেকর্ড ১৫ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করেছে ইরান। অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারির সেই আলোচিত ৪৭ ডলারের হিসাবটি কোনো উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নয়; বরং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার জাল এড়িয়ে ‘ছায়া বাজারে’ তেল বিক্রি করতে এটি ছিল তেহরানের দেওয়া বিপুল ছাড়ের চিত্র। এক অর্থে, বৈশ্বিক এই জ্বালানি সংকট বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হলেও, নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরানের অর্থনীতির জন্য তা এক অভাবনীয় সুযোগ তৈরি করেছে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)




