আমাদের যত পিপি

বন্য প্রাণী সংরক্ষক ও স্কুলশিক্ষক বখতিয়ার হামিদের আমন্ত্রণে বিশেষ এক পাখির খোঁজে চুয়াডাঙ্গার বেলগাছি গ্রামের বকচর বিলে গিয়েছি। বিল ছোট হলেও প্রাকৃতিক পরিবেশ ভালো। বক, ডাহুক, জলমুরগি, মাছরাঙা, সরালি হাঁস ও অন্যান্য জলচর পাখির অভাব নেই। বর্ষা শেষ হয়ে শরৎ এসেছে। তাই তালপাকা গরম। ক্যামেরা হাতে বিলের চারদিকে বিশেষ পাখিটিকে খুঁজছি। শার্ট ঘামে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। হঠাৎই দুটি ছানাসহ বিশেষ পাখিটি হাজির হলো। পাঁচ-ছয়টি ক্লিক করেছি। এমন সময় বৃষ্টি নামল। ভালো ছবি তুলতে পারলাম না।

পরদিন সকাল সকাল বের হলাম। রৌদ্রোজ্জ্বল চমৎকার দিন। বিল বরাবর খানিকটা হাঁটতেই একটি ছানার দেখা পেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও দুটি যোগ দিল। ছানাগুলোর বয়স তিন-চার সপ্তাহ হবে। ঘণ্টাখানেক পর বয়স্ক পাখিটি এল। এবার চমৎকার ছবি তুললাম। ঘটনা ২০১৮ সালের ২১ থেকে ২২ সেপ্টেম্বরের।

চলতি বছরের ২ মে—আরেকটি ঘটনা। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের প্রাণিচিকিৎসার ছাত্রদের বন্য প্রাণী প্রজনন ও রোগ চিকিৎসা বিষয়ের মাঠকর্মে রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় গেলাম। জলহস্তীশালা পেরিয়ে মায়া হরিণশালার উল্টো পাশের প্রাকৃতিক জলাভূমিতে বকচর বিলের পাখিগুলোর দুটি নিকটাত্মীয় পাখি প্রজননরত দেখলাম। এর আগে বহুবার ছানাসহ পাখিগুলো দেখেছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকে।

চুয়াডাঙ্গার বকচর বিল ও জাতীয় চিড়িয়াখানায় দেখা পাখিগুলো জলকোপি বা Jacanidae গোত্রের পাখি। মাঝারি আকার ও দীর্ঘ পায়ের পাখিগুলোর আঙুল অনেকটা মাকড়সার জালের মতো ছড়ানো। এ ওপর ভর দিয়ে অনায়াসেই ওরা জলজ উদ্ভিদের ওপর দিয়ে হেঁটে যায়। এই গোত্রের স্ত্রীরা ডিম পেড়েই খালাস। ডিমে তা দেওয়া ও ছানা লালনপালনের দায়িত্ব শুধুই পুরুষের। চেহারা, আকার, খাদ্যাভ্যাস ও আচার-আচরণে খেনি (Railidae) গোত্রের পাখিদের সঙ্গে মিল থাকলেও এরা মোটেও খেনিদের নিকটাত্মীয় নয়। বরং বাটান ও গুলিন্দাদের নিকটাত্মীয়। এদের পালক বর্ণিল ও উজ্জ্বল। সচরাচর স্বাদুপানির ছোট জলাশয়, হ্রদ, পুকুরে বিচরণ করে। সারা বিশ্বে এই গোত্রের আট প্রজাতির পাখির অস্তিত্ব থাকলেও বাংলাদেশে আছে মাত্র দুটি— জলপিপি ও নেউপিপি।

চুয়াডাঙ্গার বেলগাছি গ্রামের বকচর বিলে নেউপিপি বা জলময়ূর

জাতীয় চিড়িয়াখানায় দেখা চকচকে নীলচে-বেগুনি-কালো পাখিটির নাম জলপিপি বা দলপিপি। ইংরেজি ও বৈজ্ঞানিক নাম যথাক্রমে ব্রোঞ্জ-উইঙ্গড জ্যাকানা ও Metopidius indicus। অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গার বকচর বিলের পাখিটি নেউপিপি, নেউ, পদ্মপিপি, মেওয়া বা জলময়ূর। ইংরেজি ও বৈজ্ঞানিক নাম যথাক্রমে ফিজ্যান্ট-টেইল্ড জ্যাকানা ও Hydophasianus chirurgus। উভয়ই এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা মেলে।

জলপিপি ভাসমান পাতার ওপর হেঁটে হেঁটে জলজ উদ্ভিদের কচি পাতা, অঙ্কুর, বীজ, পোকামাকড় ও অমেরুদণ্ডী প্রাণী খায়। জলপিপি বাঁশি বাজানোর মতো করে ‘সিক-সিক-সিক…’ ও নেউপিপি ‘নে-উ-ইউ…নে-উ-ইউ…নে-উ-ইউ…’ শব্দে ডাকে।

উভয়ের প্রজননকাল মে থেকে সেপ্টেম্বর। স্ত্রীরা এক মৌসুমে একাধিক পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়। শাপলা, পদ্ম বা ভাসমান কোনো উদ্ভিদের পাতার ওপর বাসা বানিয়ে তাতে চারটি চকচকে ডিম পাড়ে। জলপিপির ডিম বেগুনি কারুকাজসহ লালচে-বাদামি ও নেউপিপিগুলো জলপাই-বাদামি। পুরুষ একাই ডিমে তা দেয় এবং ছানাদের লালনপালন করে। ডিম ফোটে ২৩ থেকে ২৬ দিনে। ছানারা বেশ ইঁচড়েপাকা। ডিম থেকে ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটতে, সাঁতরাতে ও ডুব দিতে পারে।

আ ন ম আমিনুর রহমান: পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

Scroll to Top