দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে রপ্তানি খাতে কিছুটা স্বস্তির আভাস মিলেছে। টানা আট মাস পতনের পর আবারও বেড়েছে রপ্তানি আয়। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। এর আগে সর্বশেষ প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে।
একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার আরেক প্রধান উৎস প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সেও ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে। গত এপ্রিলে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানিয়েছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের এপ্রিলে রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়েছে। এ মাসে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের পণ্য, যা এক বছর আগে ছিল প্রায় ৩০২ কোটি ডলার।
তবে এই প্রবৃদ্ধি নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী নন রপ্তানিকারকেরা। তারা বলছেন, গত বছরের এপ্রিল মাসে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে টানা ১০ দিনের ছুটি থাকায় রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকর থাকায় রপ্তানি আরও কমে যায়। ফলে ওই সময়ের নিম্ন ভিত্তির কারণে এবারের প্রবৃদ্ধি বেশি দেখাচ্ছে। বাস্তবে তেমন বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে মনে করছেন তারা।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছরই ঈদের সময় দীর্ঘ ছুটির কারণে রপ্তানি আয় কমে যায়। সাধারণত এই সময়ে অন্যান্য মাসের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রপ্তানি কম হয়। গত বছরের এপ্রিলেও একই কারণে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২৩ কোটি ডলার কম রপ্তানি হয়েছিল। অন্যদিকে ঈদ ছাড়া মাসগুলোতে গত কয়েক বছরে গড়ে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের রপ্তানি হয়ে আসছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে মোট রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩৭ কোটি ডলারে। আগের বছর একই সময়ে এই আয় ছিল ৪ হাজার ২১ কোটি ডলার।
এপ্রিলে নিট ও ওভেন মিলিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এই খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ১৭২ কোটি ডলার। এ ছাড়া অন্যান্য পণ্যের রপ্তানিও মোটামুটি ইতিবাচক রয়েছে।
অন্যদিকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহও শক্তিশালী রয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে এপ্রিলে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ৩১৩ কোটি ডলার। টানা পাঁচ মাস ধরে গড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসছে, যা বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।
ব্যাংকারা বলছেন, চলতি মে মাসের শেষে কোরবানির ঈদ থাকায় এ মাসেও রেমিট্যান্স বাড়তে পারে। পাশাপাশি অর্থ পাচার রোধে কঠোর অবস্থান বজায় থাকলে হুন্ডি কমে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ আরও বাড়বে। প্রবাসে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকারও বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।
রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে গত মার্চে সর্বোচ্চ প্রায় ৩৭৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা একক মাসে রেকর্ড। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি এবং ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসে। গত বছরের মার্চেও প্রথমবারের মতো তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল- প্রায় ৩৩০ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৯৩৩ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধি ডলার বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে।
বর্তমানে দেশে ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় স্থিতিশীল রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে। আর বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ৩০ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।




