চিরবিদায় কেতকী কুশারী ডাইসন, রেখে গেলেন অনন্য সৃষ্টির ভুবন

চলে গেলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও গবেষক কেতকী কুশারী ডাইসন। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডের শহরতলি কিডলিংটনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন এই বিদগ্ধ সাহিত্যিক। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারাল এমন এক সৃষ্টিশীল মানুষকে, যিনি ভৌগোলিক দূরত্বকে কখনো মাতৃভাষার সঙ্গে সম্পর্কের পথে বাধা হতে দেননি।
বাংলা ও ইংরেজি- দুই ভাষাতেই সমান সাবলীল এই সাহিত্যিক কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক ও অনুবাদে রেখে গেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও চিত্রকর্ম নিয়ে তাঁর গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রবীন্দ্রসাহিত্যকে ইংরেজিভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১৯৪০ সালের ২৬ জুন জন্ম কেতকীর। বাবার চাকরির সূত্রে বাংলাদেশের মেহেরপুরেও ছিলেন এই সাহিত্যিক। ১৯৫৮ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ পরীক্ষায় রেকর্ড নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৩ সালে সেখান থেকে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ১৯৭৫ সালে পিএইচডি অর্জন করেন।
অক্সফোর্ডেই তাঁর পরিচয় হয় পদার্থবিদ্যার ছাত্র রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে। ইয়র্কশায়ারের বাসিন্দা রবার্টের সঙ্গে সেই পরিচয় ধীরে ধীরে প্রেমে রূপ নেয়, পরে তাঁরা বিয়ে করেন। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নেওয়ার পর স্বামীর পদবি নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করেন কেতকী। তবে বিদেশে বসবাস করেও বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি। বরং মাতৃভাষার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা তাঁকে আজীবন বাংলা ভাষায় লিখে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।

১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বল্কল’। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি ছয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘নারী, নগরী’, ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ ও ‘জল ফুঁড়ে আগুন’। ইংল্যান্ডে বসবাসকারী অভিবাসীদের জীবনসংগ্রাম ও মানসিক টানাপড়েনের চিত্র তুলে ধরে ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ বিশেষভাবে পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে।
গবেষণা ও প্রবন্ধ রচনাতেও কেতকীর ছিল গভীর দখল। ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ তাঁর বহুল আলোচিত কাজগুলোর একটি। ১৯৮৬ সালে এই গ্রন্থের জন্য প্রথমবার আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। ১৯৯৭ সালেও একই পুরস্কার পান। এ ছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুবনমোহিনী দাসী পদকও অর্জন করেন।
সুশোভন অধিকারী ও রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’, পাশাপাশি ‘ভাবনার ভাস্কর্য’ ও ‘শিকড়বাকড়’ তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে।

কবিতা, প্রবন্ধ ও গবেষণার পাশাপাশি নাটকও লিখেছেন কেতকী। ‘রাতের রোদ’ ও ‘সুবর্ণরেখা’ তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজিতেও কবিতা, নাটক ও প্রবন্ধ লিখেছেন। দুই ভাষায় সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বুদ্ধদেব বসুর বিভিন্ন রচনা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন তিনি।
কেতকীর জীবন ও সাহিত্যচর্চায় রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর প্রভাব ছিল গভীর। ইংরেজি সাহিত্যে অসাধারণ মেধার পরিচয় দেওয়ার পরও বাংলা লেখাকে কখনো ছেড়ে দেননি তিনি। ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুদ্ধদেব বসুকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকেই বাংলা ভাষায় লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কেতকী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি ধরে রেখেছেন।
জীবনের শেষ পর্ব অবশ্য ছিল নানা শারীরিক প্রতিকূলতায় ভরা। প্রায় এক দশক আগে দৃষ্টিশক্তি হারান কেতকী। কিন্তু দৃষ্টিহীনতাও তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। নিজের সাহিত্যকর্ম চালিয়ে গেছেন তিনি। এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে ছিলেন স্বামী রবার্ট ডাইসন। কেতকীর সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখতে তিনি সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছেন।

২০২১ সালে করোনার টিকা নেওয়ার পরপরই স্ট্রোক করেন কেতকী। এরপর থেকে তিনি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। গত ৩১ আগস্ট হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার ভোরে থামে তাঁর দীর্ঘ লড়াই।
স্বামী রবার্ট ডাইসন এবং দুই পুত্র ভার্জিল পূজারী ডাইসন ও ইগর নীলাদ্রি ডাইসনকে রেখে গেছেন কেতকী কুশারী ডাইসন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাঁর বিপুল সাহিত্যসম্ভার। ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে বাংলা ভাষাকে ধারণ করে যাওয়া এই সাহিত্যিক তাঁর কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা ও অনুবাদের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পাঠকের কাছে বেঁচে থাকবেন- এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষিদেরও!
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…