৪ হাজার কোটি টাকার ইনজেকশন: বরাদ্দ বাড়ছে, তবু কেন সুস্থ হচ্ছে না স্বাস্থ্যখাত? | চ্যানেল আই অনলাইন

৪ হাজার কোটি টাকার ইনজেকশন: বরাদ্দ বাড়ছে, তবু কেন সুস্থ হচ্ছে না স্বাস্থ্যখাত? | চ্যানেল আই অনলাইন

রাজধানীর করাইল বস্তির বাসিন্দা রহিমা বেগমের জ্বর হয়েছে সপ্তাহখানেক। সরকারি হাসপাতালে গিয়ে দীর্ঘ লাইন আর ভিড় দেখে ফিরে এসেছেন তিনবার। শেষে পাড়ার একজন অনভিজ্ঞ “পল্লী চিকিৎসকের” কাছ থেকে ওষুধ কিনে খাচ্ছেন, যদিও জানেন না তা কতটা নিরাপদ। রহিমার এই বাস্তবতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের এক গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি, যেখানে বরাদ্দ বাড়লেও প্রান্তিক মানুষের ভোগান্তি কমছে না।

বাজেট বেড়েছে রেকর্ড হারে, তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য ব্যয় জিডিপির ১ শতাংশের গণ্ডি পেরিয়ে দাঁড়িয়েছে ১.১ শতাংশে। সংখ্যার হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন।

কিন্তু স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন এর আগেই সুপারিশ করেছিল, জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ রাখতে হবে। বাস্তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ছিল মাত্র ৫.৩ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের মানদণ্ড থেকে বাংলাদেশ এখনো অনেক দূরে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, সংখ্যায় যত বড় অগ্রগতিই দেখানো হোক, প্রকৃত চাহিদার তুলনায় তা এখনো নিতান্তই অপ্রতুল।

অপচয়ের চিত্র: যন্ত্র আছে, রোগী নেই; রোগী আছে, যন্ত্র নেই
স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক সম্পদের অপব্যবহার। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক মালিকদের একটি সংগঠনের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিত্ব সম্প্রতি গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ অপচয় হয়, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হয়, অথচ প্রয়োজনীয় যন্ত্র অব্যবহৃত পড়ে থাকে।

এর একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত হলো ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহৃত লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর (লিনাক) যন্ত্র। বেসরকারি খাতের একটি হাসপাতালে মাত্র দুটি লিনাক যন্ত্র দিয়ে প্রতিদিন ১৬০ থেকে ২২০ জন রোগীকে রেডিওথেরাপি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

বিপরীতে, সরকারি ক্যান্সার হাসপাতালগুলোতে ৮ থেকে ১২টি পর্যন্ত লিনাক যন্ত্র থাকা সত্ত্বেও রোগীসেবার সংখ্যা তুলনামূলক কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়, এটি নিখাদ ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা। দুর্নীতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং অদক্ষ সম্পদ ব্যবহার, এসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত হলেও এর প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কখনো সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি। ফলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

নগর দরিদ্রের বাড়তি বোঝা
স্বাস্থ্য বাজেট অপচয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর, যাদের সংখ্যা মোটেও কম নয়। বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বস্তিতে বসবাস করে, যেখানে বসবাস ও স্বাস্থ্যবিধির পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ঢাকা শহরের ১২ হাজারের বেশি বাসিন্দার ওপর পরিচালিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের মাসিক পারিবারিক আয়ের প্রায় ৩৩ শতাংশ চিকিৎসা ব্যয়ে খরচ করতে বাধ্য হয়, যেখানে সবচেয়ে ধনী গোষ্ঠী ব্যয় করে মাত্র ৫.২ শতাংশ, অর্থাৎ ছয় গুণেরও বেশি ব্যবধান। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বস্তিবাসীরা প্রকৃতপক্ষে অ-বস্তি এলাকার বাসিন্দাদের তুলনায় চিকিৎসায় কম খরচ করেন, যা স্বাস্থ্যের প্রয়োজন কম হওয়ার লক্ষণ নয়, বরং সামর্থ্যের অভাবে চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়ার প্রমাণ।

দেশের অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোতে পরিচালিত এক গুণগত গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ লাইন ও ভিড়ের কারণে দরিদ্র রোগীরা প্রায়ই অবহেলার শিকার হন, আবার বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয় তাদের সামর্থ্যের বাইরে। ফলে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে অপ্রশিক্ষিত বা অনানুষ্ঠানিক চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন,যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক।

জাতীয় পর্যায়ের হিসাবেও এই চিত্র স্পষ্ট। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৪ থেকে ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যার প্রধান কারণ ওষুধের ব্যয়। প্রতি বছর প্রায় ৮৬ লাখ মানুষ শুধু চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশের সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কভারেজ সূচক মাত্র ৫৪,১০০-এর মধ্যে, আর প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ চিকিৎসা ব্যয়জনিত আর্থিক সংকটে পড়েছে।

জনবল সংকট: চিকিৎসক ও নার্সের চরম ঘাটতি
অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি জনবল সংকটও তীব্র। প্রতি হাজার জনসংখ্যায় বাংলাদেশে চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ০.৮৩ জন, মোট প্রায় ৯০ হাজার নিবন্ধিত চিকিৎসক দিয়ে ১৮ কোটির বেশি মানুষের সেবা দেওয়া হচ্ছে। নার্স সংকট আরও ভয়াবহ; প্রয়োজনের বিপরীতে মাত্র ২৮ শতাংশ নার্স কর্মরত আছেন, ৩ লাখ ১০ হাজারের প্রয়োজনের বিপরীতে মাত্র ৫৬ হাজার ৭৩৪ জন। এর ফলে দীর্ঘ অপেক্ষা, দ্রুত ও অসম্পূর্ণ পরামর্শ এবং অতিরিক্ত কর্মচাপে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের এক দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে।

কেন্দ্রীকরণের সংকট
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত, যার ফলে গ্রামীণ ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সম্পদ ও জনবলের অভাবে ভুগছে অথচ রোগীর চাপে ন্যুব্জ। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন গঠিত হয়ে ৩২টি সুপারিশ জমা দিলেও, বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে কোনো কার্যকর মনিটরিং কমিটি পর্যন্ত গঠিত হয়নি বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন।

সমাধানের পথ: শুধু বরাদ্দ নয়, দরকার সুশাসন
বিশেষজ্ঞ ও নীতিবিশ্লেষকদের মতামত পর্যালোচনা করলে নিম্নলিখিত দিকগুলো সমাধানের সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা হিসেবে উঠে আসে,

  • ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও অডিট ব্যবস্থা চালু করা প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ক্রয়, ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করা জরুরি, যাতে কোন যন্ত্র কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে তা রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণযোগ্য হয়। স্বতন্ত্র বার্ষিক অডিট বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন, যার প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশযোগ্য হবে।
  • বিকেন্দ্রীকরণ ত্বরান্বিত করা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাজেট বরাদ্দের ক্ষমতা আংশিকভাবে হস্তান্তর করা দরকার, যাতে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী সম্পদ বণ্টন করা যায় এবং ঢাকা-কেন্দ্রিকতা কমে।
  • নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি সম্প্রসারণ বিদ্যমান নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প (ইউপিএইচসিএসডিপি)-এর আওতা বস্তি এলাকায় আরও সম্প্রসারিত করে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সেবা নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষত দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায়।
  • জনবল ঘাটতি দ্রুত পূরণ স্বল্পমেয়াদে কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার ও প্যারামেডিক নিয়োগ বাড়িয়ে জরুরি ঘাটতি মেটানো এবং দীর্ঘমেয়াদে নার্সিং ও মেডিকেল শিক্ষায় আসন সংখ্যা ও বৃত্তি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
  • ওষুধ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ যেহেতু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ওষুধ কেনায় ব্যয় হয়, তাই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করে তা সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকে বিনামূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা

উপরোক্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রস্তাব করা যায়,
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের ৩২ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন তদারকির জন্য অবিলম্বে একটি স্বাধীন মনিটরিং কমিটি গঠন করা এবং প্রতি ছয় মাসে অগ্রগতি প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা।

    • বাজেট বরাদ্দ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য একটি সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ প্রণয়ন করা।
    • ব্যয়বহুল চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজন-মূল্যায়ন (নিড অ্যাসেসমেন্ট) বাধ্যতামূলক করা, যাতে চাহিদাবিহীন স্থানে ব্যয়বহুল যন্ত্র বসিয়ে অর্থ অপচয় বন্ধ হয়।
    • সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা রোডম্যাপ (২০২৬-২০৩৫) দ্রুত চূড়ান্ত করে তা সংসদে উপস্থাপন করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া।
    • নগর স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিভক্ত থাকায় সৃষ্ট সমন্বয়হীনতা দূর করতে একটি যৌথ নগর স্বাস্থ্য সমন্বয় সেল গঠন করা।
    • হাসপাতাল পর্যায়ে ই-হেলথ কার্ড ও ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন করে সম্পদ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

বাজেটের অঙ্ক বাড়ানো সহজ; কিন্তু প্রতিটি টাকা সঠিক জায়গায় পৌঁছানো নিশ্চিত করা কঠিন কাজ। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে যে সংকট বিদ্যমান, তা মূলত অর্থের অভাবের চেয়ে অর্থ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। রহিমা বেগমের মতো লাখো নগর দরিদ্র মানুষের জন্য প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন বরাদ্দকৃত অর্থের প্রতিটি টাকার হিসাব থাকবে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কেন্দ্র থেকে প্রান্তে পৌঁছাবে। তা না হলে, বাজেটের সংখ্যা যতই বড় হোক না কেন, হাসপাতালের সামনের দীর্ঘ লাইন আর কমবে না।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Scroll to Top