সারকথা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আধুনিকীকরণ ও পল্লি উন্নয়নবিষয়ক ভাবনায় একটি বড় পরিবর্তন আসে। আগে যেখানে ‘কৃষিভিত্তিক গণতন্ত্রের’ মতো বৃহত্তর বিষয়গুলো প্রাধান্য পেত, তা ক্রমেই সরে গিয়ে কেবল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য উৎপাদনের মতো সংকীর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর (টেকনোক্র্যাটিক) পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উপনিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রক্রিয়া (ডিকলোনাইজেশন) এবং স্নায়ুযুদ্ধকালীন কৃষি আধুনিকীকরণের রাজনীতির মধ্যে যে বহুমুখী সম্পর্ক ছিল, তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই প্রবন্ধে মূলত সেই পরিবর্তনের কারণ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পল্লি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কীভাবে শুরু হয়েছিল, কীভাবে পরিচালিত হতো এবং এর গতিপথ নিয়ে যে বিতর্ক ছিল—ফোর্ড ফাউন্ডেশনের নথিপত্র ঘেঁটে এই প্রবন্ধে কিছু প্রাথমিক উত্তর তুলে ধরা হয়েছে।
ভূমিকা
আর্থার র্যাপার ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে (কুমিল্লা একাডেমি) যুক্ত ছিলেন। তিনি একাডেমির বাইরের মানুষ হিসেবে একাডেমির কাজের একজন ‘মূল্যায়নকারী’ ছিলেন। তখন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন খ্যাপাটে আমলা থেকে জনহিতৈষী সংস্কারক হিসেবে রূপান্তরিত হওয়া ব্যক্তিত্ব আখতার হামিদ খান। একাডেমির এসব কার্যক্রম ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও পাকিস্তান সরকারের যৌথ অর্থায়নে এবং মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির কৃষি কলেজের কারিগরি পরামর্শে পরিচালিত হতো। ১৯৬২ সাল নাগাদ র্যাপার আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ সমাজতত্ত্ব নিয়ে যুগান্তকারী কাজ করেছেন। ১৯৩০-এর দশক থেকে বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ ও কৃষি-গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর শেষ বড় গবেষণা কাজটি ছিল কুমিল্লা প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের একটি প্রায়োগিক খতিয়ান। তাঁর নিজ দেশের জীবন ও সমাজ নিয়ে লেখা আগের কাজগুলোয় সাবলীল রসবোধ ও তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি লক্ষ করা যেত। তবে কুমিল্লার ওপর করা তাঁর কাজের গদ্যভঙ্গি কিছুটা যান্ত্রিক বা পদ্ধতিগত ছিল। তাঁর জীবনীকারের ভাষায়, এটি ছিল একটি ‘নথিভুক্তকরণ…কোনো হৃদয়গ্রাহী তথ্যচিত্র নয়’ (মাজারি ২০০৬: ৩০৪)।
চেনা পরিবেশের বাইরে থাকলেও স্থান ও কাল সম্পর্কে র্যাপারের প্রখর সংবেদনশীলতা এবং সাধারণের মধ্যে অসাধারণকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা কুমিল্লাতেও অম্লান ছিল। সেখানে কাটানো ২৬ মাসের ডায়েরি এবং আধা আনুষ্ঠানিক আলাপচারিতাগুলোতে আমরা উত্তর-ঔপনিবেশিক ‘বিশ্ব-নির্মাণের’ এক প্রতিচ্ছবি পাই, যেখানে প্রাত্যহিক চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে মহৎ আদর্শগুলো মূর্ত হয়ে উঠছিল (গেটাচিউ ২০১৯; কুপার ২০০৫)। ১৯৬৩ সালে র্যাপার লক্ষ করেন, সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একাডেমির কার্যক্রম কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অবকাঠামোতে ‘প্রকৃত উন্নয়ন’ ঘটাচ্ছে। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের চেয়েও যে বিষয়টি তাঁকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল, তা হলো সাফল্য অর্জনের পদ্ধতি (র্যাপার ১৯৬৩)। এসব কার্যকর পদ্ধতি র্যাপারের শৈশবে দেখা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের উত্তর ক্যারোলাইনার পাহাড়ি অঞ্চলের জীবনযাপনের কথা মনে করিয়ে দিত। এই মিল তিনি তাঁর পরবর্তী গবেষণার অভিজ্ঞতায় খুঁজে পাননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়১৯২০-এর দশকে কার্ল সি. টেলর ও অন্য সমাজবিজ্ঞানীদের সঙ্গে গবেষণাকালে জর্জিয়ার মেকন কাউন্টির বড় আকারের কৃষি–পরবর্তী অর্থনীতি ও বিরাজমান বর্ণবাদী বৈষম্যের কথা (মাজারি ২০০৬: অধ্যায় ৫)।
কুমিল্লা একাডেমির শিক্ষক, কৃষক ও সরকারি কর্মকর্তাসহ তরুণ প্রশিক্ষণার্থীরা র্যাপারকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সড়ক, টেলিফোন ও বিদ্যুতের মতো আধুনিক জীবনের অপরিহার্য সেবাগুলো আমেরিকায় তাঁর নিজ শহরে সাধারণ মানুষের কাছে কীভাবে পৌঁছাল। র্যাপার প্রক্রিয়াটিকে বর্ণনা করেছিলেন এভাবে: সেখানকার গ্রামীণ জনপদগুলো সরাসরি ‘দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার’ মাধ্যমে মানুষকে যুক্ত করেছিল।এর ফলে তারা নিজেদের প্রয়োজন ও স্বার্থগুলো নিজেরাই চিহ্নিত করতে পারত। ফলস্বরূপ, তারা শ্রম,কাঁচামাল এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ব্যক্তিগত অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এই প্রক্রিয়া যখন পরিণত রূপ পায়, তখন জনগণের ভোটের (গণতান্ত্রিক দাবি) পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি তহবিল থেকে এই সেবাগুলোর সরবরাহ বাড়তে থাকে (র্যাপার ১৯৬৪)। সংক্ষেপে বলতে গেলে, প্রাত্যহিক শাসনে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র একটি ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল, যা রাষ্ট্র-সমর্থিত ‘পল্লি উন্নয়ন’-এর দাবিকে অনিবার্য করে তুলেছিল (ইমারওয়ার ২০১৫; হার্ট ২০১০; বোস ১৯৯৭)।
আখতার হামিদ খানের নির্দেশনায় কুমিল্লা একাডেমি আপাতদৃষ্টিতে একই রকম একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। কিন্তু র্যাপার সম্ভবত একটি মৌলিক পার্থক্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন—আর তা হলো বিশালকায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার এবং সেই রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদী পণ্য-সম্পর্কের অসম ও সমন্বিত বিকাশ (ইনস ২০১৮; অ্যানিভাস ও মতিন ২০১৬)। এই প্রেক্ষাপটটি গ্রামীণ বৈষম্যকে আরও বদ্ধমূল করেছিল এবং খাজনা আদায়, ভূমিস্বত্ব ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাত্যহিক জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল। সংক্ষেপে,উপনিবেশগুলোর সচেতন জনসমাজ আধুনিক রাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারের এই দ্বৈত আধিপত্য দ্বারা প্রভাবিত ছিল। র্যাপার তাঁর নিজের দেশের ফেলে আসা আদর্শিক স্মৃতির নিরিখে যে ‘উন্নয়নবাদী’ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, সেই অনুযায়ী উপনিবেশের জনগণ তখনো ‘ভোটের মাধ্যমে’ রাষ্ট্র বা বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি।
তাঁর নিজের কাজগুলোই অন্য এক ধরনের তুলনামূলক বিশ্লেষণের ইঙ্গিত দেয়, যা ১৯৬০-এর দশকের কুমিল্লার প্রেক্ষাপটে সম্ভবত অধিকতর প্রাসঙ্গিক ছিল। জর্জিয়ার গ্রামীণ জনপদে যেখানে পুরোনো সামাজিক কাঠামো তখনো অটুট ছিল,সেখানকার অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও বর্ণবাদী অসন্তোষের গতিপ্রকৃতি তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। অন্যদিকে যেসব এলাকায় কৃষি–পরবর্তী ভাগচাষ–ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল এবং দরিদ্র শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে স্বাধীন কৃষক হয়ে ওঠার ও অকৃষি খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল—তা র্যাপারকে পুরোনো ব্যবস্থার এক পদ্ধতিগত সমালোচনায় উদ্বুদ্ধ করে (মাজারি ২০০৬: অধ্যায় ৫)। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে তাঁর নাগরিক সক্রিয়তার মূলে ছিল এই উপলব্ধি; এটিই তাঁর তুলনামূলক-ঐতিহাসিক সমাজবিজ্ঞানে একধরনের ‘ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাস’ তৈরি করেছিল, যা ছিল সামাজিক অগ্রযাত্রার মিছিলে পিছিয়ে পড়া বা বিচ্যুত মানুষের অবস্থা বোঝা এবং তাদের পক্ষে সে অনুযায়ী কাজ করার একটি মাধ্যম।
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এশিয়া ও আফ্রিকায় উপনিবেশমুক্তির যে লহর উঠেছিল, তাতে পুরোনো ব্যবস্থা এবং এর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিন্যাসের একধরনের ‘বিলোপ’ দেখা যায়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক আচার এবং সম্পর্কগুলোকে দরিদ্র ও বঞ্চিতদের পক্ষে পুনর্গঠনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই প্রসঙ্গে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা ফ্রান্সিস সাটন যেমনটি বলেছিলেন: ‘একধরনের বর্ণপ্রথা বিদ্যমান ছিল, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই সামাজিক আচরণ ও কর্তৃত্ব নির্ধারিত হতো গায়ের রং এবং নৃতাত্ত্বিক উৎসের ভিত্তিতে। ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর সেই প্রবাদপ্রতিম প্রতাপ কেবল আগ্নেয়াস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ, পরোক্ষ শাসন বা প্রজাদের কৌশলী বশ্যতার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। ঔপনিবেশিক সমাজের এই কাঠামোর অর্থ ছিল—সরকার নিজেই ছিল তাদের শ্রেণিবিন্যস্ত সামাজিক কাঠামোর সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রকাশ; আর ক্রমবর্ধমান সম–অধিকারবাদী মূল্যবোধের যুগে এটিই হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের প্রধান দুর্বলতা (অ্যাকিলিস হিল) (সাটন ২০০৫: ৪৪)।’
মাঠপর্যায়ের স্পন্দন বোঝার সহজাত ক্ষমতা থাকায় র্যাপার পূর্ব পাকিস্তানের এই পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। যাঁরা সম–অধিকারবাদী মূল্যবোধে আলোড়িত হচ্ছিলেন, তাঁদের উদ্দেশে তিনি তাঁর কৈশোরের সেই গ্রামীণ জনপদের এক আদর্শায়িত ছবি তুলে ধরতেন। এই শিক্ষামূলক বর্ণনায় তিনি এমন এক কাল্পনিক নির্দোষ সময়ের কথা মনে করিয়ে দিতেন, যা দৃশ্যত ঔপনিবেশিক-পুঁজিবাদী শ্রেণিবিন্যাস দ্বারা কলুষিত ছিল না; যেখানে সমাজ একটি ডুর্খাইমীয় ‘গেমাইনশ্যাফট’ (gemeinschaft)বা অখণ্ড সংহতির ধারণায় পুষ্ট হয়ে একটি ‘জনগোষ্ঠী’ হিসেবে নিজ নিজ ভূমিকা পালন করত।
র্যাপারের এই প্রতিক্রিয়া ছিল মানবপ্রগতির সম্ভাবনায় একধরনের ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাস থেকে প্রসূত—এটি অন্তত তাঁর ক্ষেত্রে কোনো নতুন বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের সেবায় নিয়োজিত নীতিহীন যৌক্তিকতা ছিল না। সামাজিক বাস্তবতা এবং এই প্রগতির আদর্শিক লক্ষ্যের মধ্যে যে ব্যবধান, তা মূলত আধুনিক সামাজিক চিন্তার সাধারণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকেই নির্দেশ করে (হথর্ন ১৯৮৭)। র্যাপারের ক্ষেত্রেও এই চিন্তাভাবনা প্রবল টানাপোড়েনে পূর্ণ ছিল এবং ঠিক এ কারণেই তা তৎকালীন সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করে। র্যাপার মন্তব্য করেছিলেন, ‘কিছু দিক থেকে কুমিল্লার পরিস্থিতির সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো ব্যক্তির অপরিসীম গুরুত্ব; কেবল আখতার হামিদ খান নন, বরং রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীরাও… (র্যাপার ১৯৬৪)।’ বাস্তবে তিনি যে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার পক্ষে কথা বলতেন, এই মন্তব্যটি ছিল তার বিপরীতে গিয়ে ঔপনিবেশিক ধাঁচের রাষ্ট্রতান্ত্রিক চর্চার এক পরোক্ষ স্বীকৃতি, যেখানে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রতিনিধি ও দপ্তরগুলো ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত জনকল্যাণমুখী প্রকল্প নিয়ন্ত্রণে এক অতিমাত্রিক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিল। এই টানাপোড়েন নিচ থেকে উঠে আসা তাঁর ‘অংশগ্রহণমূলক আদর্শ’কে সংকুচিত করে ফেলেছিল। এটি একই সঙ্গে আধুনিকায়নের সেই আধিপত্যশীল ধারাকেই পুনরায় উৎপাদন করছিল, যেখানে প্রাক্তন উপনিবেশের জনগণকে শাসনভার গ্রহণে অপ্রস্তুত মনে করা হতো—যেন তারা ‘উন্নয়ন প্রক্রিয়ার শুরুতে একধরনের সুখানুভূতির স্তরে রয়েছে’ (র্যাপার ১৯৬৪)।
র্যাপারের এই উপলব্ধির ভেতরের দ্বন্দ্ব বা বৈপরীত্য একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন সামনে আনে—র্যাপার ও আখতার হামিদ খানদের প্রস্তাবিত ‘কৃষি গণতন্ত্রের’ অগ্রাধিকারগুলো কেন ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে অবহেলিত হলো? কেন তার বদলে খাদ্য উৎপাদন ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে নতুন ‘পল্লি উন্নয়ন’ সমস্যার দুই মূল কেন্দ্র হিসেবে একটি বিশেষজ্ঞনির্ভর বা টেকনোক্র্যাটিক কাঠামোয় আবদ্ধ করা হলো? এই গবেষণা প্রবন্ধে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের বিউপনিবেশায়ন এবং স্নায়ুযুদ্ধকালীন কৃষি আধুনিকায়নের রাজনীতির বহুমুখী সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক সমাজ এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠনের পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতির মাধ্যমে এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক নৃবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে করা একটি বৃহৎ গবেষণার অংশ। এখানে আমি ১৯৬০-এর দশকের পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর ফোর্ড ফাউন্ডেশনের নথিপত্র থেকে প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে কিছু প্রাথমিক বিশ্লেষণ পেশ করেছি।
স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপট
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আক্রমণ করে। এ ঘটনার পর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জনবুদ্ধিজীবী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা ‘জাতিগঠন’ শীর্ষক একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন জাতিগঠনমূলক প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য ফ্রান্সিস সাটনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সাটনের উপস্থাপনা পরবর্তী সময়ে ফুকুয়ামা সম্পাদিত একটি সংকলনে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি দাবি করেন যে বিউপনিবেশায়নের সেই ‘স্বর্ণলগ্নে’ বা বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ‘ধ্রুপদি উন্নয়ন মতাদর্শের’ যুগে মার্কিন সংস্থা ও ফাউন্ডেশনগুলো যে কারিগরি জ্ঞান ও সম্পদ সংহত করেছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল ‘স্বাগতিক দেশগুলোর স্বার্থে প্রকৃত সেবা প্রদান করা’ (সাটন ২০০৫: ৫৯)। সাটনের মতে,অনেক কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও স্বেচ্ছাসেবক তাঁদের নিজস্ব সংস্থা বা জন্মভূমির প্রতি এক অর্থে ‘অসাধু’ ছিলেন, কারণ তাঁরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ‘উন্নয়ন মতাদর্শের’ প্রতি অনুগত ছিলেন (সাটন ২০০৫: ৫৯)। এই মতাদর্শটি এর প্রায়োগিক দিকের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ছিল, যেখানে মূল কাজ ছিল ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আশা’ জাগিয়ে রাখা। একই সঙ্গে তাঁরা এটিও স্বীকার করতেন যে ক্রমবর্ধমান সম–অধিকারবাদী মূল্যবোধের যুগে বিউপনিবেশায়নের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা অর্থাৎ ‘রাজনৈতিক গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য এই আশা একটি প্রয়োজনীয় শর্ত হলেও তা যথেষ্ট ছিল না (সাটন ২০০৫: ৬০-৬১)।
এ ধরনের আকাঙ্ক্ষাগুলো মূলত তৃতীয়–বিশ্ববাদের সমাজতান্ত্রিক আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল। সে সময় উত্তর ঔপনিবেশিক নেতা–কর্মীরা বাস্তব রাজনীতি (রিয়্যালপলিটিক) এবং আদর্শগত—উভয় কারণেই বিশ্ব সাম্যবাদের প্রতি ক্রমবর্ধমানভাবে আকৃষ্ট হচ্ছিলেন (গেটাচিউ ২০১৯; মিসকোভিচ ও অন্যান্য ২০১৪)। তৃতীয় বিশ্বের বিশাল জনগোষ্ঠী তখন গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাস করত এবং কৃষিভিত্তিক জীবিকার ওপর নির্ভরশীল ছিল। বৈশ্বিক স্নায়ুযুদ্ধের ক্রমবর্ধমান দ্বিমুখী আদর্শিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মার্কিন কুশলী ও নীতিনির্ধারকেরা তাই ভূসম্পত্তি, কর–ব্যবস্থা এবং বাজার–সম্পর্কের আমূল পরিবর্তনের বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেন। কেননা বৈশ্বিক দক্ষিণের কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোতে বিরাজমান সশস্ত্র বিপ্লবী প্রবণতা তখন এ ধরনের আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে প্রবল করে তুলেছিল (অফনার ২০১৯; শ্রেডার ২০১৬; মারওয়ার ২০১৫)। শেষ পর্যন্ত তাঁরা মার্কিন ‘নিউ ডিল’-এর উত্তরসূরি কৃষি আধুনিকায়ন এবং তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশাব্যঞ্জক ধারণার ওপর নির্ভর করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে পরিকল্পিত ‘উপর থেকে চাপানো’ হস্তক্ষেপ (প্যাটেল ২০১৬; গিলবার্ট ২০১৫; রাইলি ২০১৪)। উত্তর-ঔপনিবেশিক কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোকে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে ‘পল্লি উন্নয়ন’ ধারণাটিকে পুনরায় সামনে নিয়ে আসা হয়, যা মূলত এই পুরোনো মার্কিন অভিজ্ঞতার সারবত্তা বহন করছিল (মিলফোর্ড ও ম্যাকক্যান ২০২২; উইন্ডেল ২০২২; স্যাকলি ২০১৩; স্যাকলি ২০১১; সিনহা ২০০৮)।
ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তায় নিউ ডিল যুগের সাবেক পরিকল্পনাবিদ এবং কৃষি গণতন্ত্রের সমর্থকেরা, যাঁদের মধ্যে র্যাপারও ছিলেন—মার্কিন আধিপত্যের অধীন একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রবক্তা বা ‘দূত’ হয়ে ওঠেন (পারমার ২০১২; বারম্যান ১৯৮৩)। অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের আদর্শগত উদ্দেশ্য নিয়ে সচেতন থাকলেও র্যাপারের দৃষ্টিভঙ্গি এ প্রকল্পগুলোর রাজনৈতিক ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সৃষ্ট টানাপোড়েন সম্পর্কে নীরব ছিল। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল রাষ্ট্রের নিম্নস্তরের কর্মচারীদের সমাজবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘গ্রাম পর্যায়ের কর্মী’ হিসেবে গড়ে তোলা। তাঁদের গবেষণার কাজ ছিল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ‘অনুভূত চাহিদা’ নিরূপণ করা। একই সঙ্গে সমবায় সংগঠনের মাধ্যমে বিপণন, ঋণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সেই চাহিদাগুলো মেটানোই ছিল তাঁদের লক্ষ্য (ইমারওয়ার ২০১৫: ৭৩; ফোর্ড ফাউন্ডেশন ১৯৫৫)। এসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘পারিবারিক খামার’ মডেলের ওপর ভিত্তি করে ক্ষুদ্র কৃষক-কৃষির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, যা কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে শিল্পায়নের পথ প্রশস্ত করবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতা, অর্থনৈতিক উচ্চবিত্ত এবং বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে এ শিল্পায়নই ছিল প্রধান কাম্য (খান ১৯৯৯; চ্যাটার্জি ১৯৯৩)।
তবে বাস্তবে গ্রামীণ জনপদের ‘অনুভূত চাহিদা’ এবং নগর-শিল্পায়নকেন্দ্রিক ‘উন্নয়ন পরিকল্পনা’র অগ্রাধিকারগুলো পরস্পর পরিপূরক ছিল না, বরং ছিল সাংঘর্ষিক, যা পল্লি উন্নয়ন কর্মীরা দ্রুতই উপলব্ধি করেন (ক্লেম ১৯৫৪)। পাকিস্তানের উদাহরণটি বিবেচনা করা যাক: স্নায়ুযুদ্ধের এক মিত্রদেশকে উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতি গঠনে সহায়তা করার আবরণে ১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকে মার্কিন সংস্থা এবং ফোর্ড ফাউন্ডেশন বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেয়। একজন অভিজ্ঞ কৃষিবিদ হোরাস হোমস একজন উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি কর্মকর্তার কাছে অকপটে স্বীকার করেছিলেন, ‘পল্লি উন্নয়ন’ শিরোনামে প্রদত্ত কৃষি প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সম্পদগুলো স্থানীয় পরিস্থিতির জন্য মোটেও উপযোগী ছিল না। পাকিস্তানের ফোর্ড ফাউন্ডেশন-সমর্থিত ‘ভিলেজ অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’–এর (V-AID) প্রশাসক আহসান উদ্দিনের কাছে এক প্রতিবেদনে হোমস উল্লেখ করেন, ‘কৃষকদের সহজাত বুদ্ধিমত্তা…তাদের স্থানীয় সরঞ্জাম ও বীজের ব্যবহার, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস্তব চর্চা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অর্জিত, তা স্থানীয় বাস্তুসংস্থান এবং কৃষকদের অভ্যাসের সঙ্গে অনেক বেশি কার্যকর (হোমস ১৯৫৪)।’ একইভাবে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের পাকিস্তান প্রতিনিধি ও কৃষি অর্থনীতিবিদ র্যান্ডাল ক্লেম পূর্ববঙ্গের ভি-এআইডি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের পর প্রতিবেদন দেন যে সেখানে আমেরিকান কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ‘পুরোপুরি অনুপযুক্ত’। তাঁর মতে, এটিই ছিল স্বাভাবিক।কারণ, ওই প্রযুক্তি ও পদ্ধতিগুলো ভিন্ন বাস্তুসংস্থানিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমিতে উদ্ভাবিত। বরং র্যান্ডাল ক্লেম সিলেটের একটি কেন্দ্রে দেশীয় প্রযুক্তি ও ফসলের পরীক্ষামূলক চাষ দেখে অত্যন্ত উৎসাহিত হন এবং তাঁর ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের এই ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন (ক্লেম ১৯৫৪)।

তবে ভি-এআইডি উপদেষ্টা জন সাউদার্ন করাচিতে মার্কিন টিসিএ অফিসের সহকর্মীদের কাছে যেমনটি উল্লেখ করেছিলেন—আসল উদ্বেগের বিষয় ছিল কারিগরি সহায়তা এবং ত্রাণ বিতরণের ‘সামাজিক পদ্ধতি’; অর্থাৎ পল্লি অঞ্চলের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রকদের সমর্থন নিশ্চিত করা (সাউদার্ন ১৯৫৩)। কৃষিভিত্তিক গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাসহ সাধারণ মানুষের ‘অনুভূত চাহিদা’ ঔপনিবেশিক আমলের রাষ্ট্রীয় চর্চা এবং শ্রেণিবিন্যস্ত সামাজিক সম্পর্কের পুনরুৎপাদনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। অথচ সাউদার্নের লক্ষ্যপূরণে এই চিরাচরিত ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখাই ছিল অপরিহার্য। স্নায়ুযুদ্ধকালীন যুক্তি–কাঠামো এই পুনরুৎপাদনকেই প্রয়োজনীয় বলে গণ্য করেছিল। ফলস্বরূপ ‘অরাজকতা’ ও ‘নাশকতা’ প্রতিরোধের দোহাই দিয়ে পল্লি উন্নয়ন ধারণাটিকে ভূমি-ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ ক্ষমতা-কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের একটি বিকল্প বা প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হয় (ক্লেম ১৯৫৪)।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নিরিখে পাকিস্তানে এ ধরনের হস্তক্ষেপের মূল কারণ কমিউনিজমের আশু হুমকি ছিল না, যা সে সময় এমনিতেও সুদূরপরাহত ছিল (আলি ২০১৫; উমর ২০০৪)। বরং প্রকৃত কারণ ছিল মিত্র কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে নবগঠিত রাষ্ট্রের পূর্ববঙ্গের জনবহুল ও ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে ঘনীভূত হতে থাকা সামাজিক অসন্তোষ। অধিকন্তু দক্ষিণ-পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়ার সম্পদ-সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পাকিস্তানের দুই অংশকে মার্কিন ঘাঁটির জন্য আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করার ভূকৌশলগত কল্পনা এই যুক্তিকে আরও সংহত করেছিল। যখন বৈশ্বিক রাজনীতিতে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন গতিশীল হচ্ছিল, তখন পাকিস্তানে একটি স্থিতিশীল উত্তর-ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়ায় (মিসকোভিচ ও অন্যান্য ২০১৪)। আইজেনহাওয়ার প্রশাসন জোর দিয়েছিল যে পাকিস্তানের ‘নিরাপত্তা’ কেবল সামরিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সুরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর জন্য প্রয়োজন ‘বাণিজ্য ও সাহায্য’-এর মাধ্যমে দেশটিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা (রাঘবন ২০১৮; অ্যাডামসন ২০০৬; ম্যাকমোহন ১৯৯৪; কফম্যান ১৯৮২)।
১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে এক সাবেক ঔপনিবেশিক বেসামরিক-সামরিক আমলাতন্ত্রের হাতে চলে যায়, যারা একটি গণতান্ত্রিক কনফেডারেট রাষ্ট্র গঠনের কোনো আকাঙ্ক্ষাকেই আমলে নিতে প্রস্তুত ছিল না। অধিকতর জনসংখ্যার কারণে এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রক্রিয়াটিই ছিল এমন—যেখানে প্রশাসনিক, শিল্প, আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতা পশ্চিম অংশেই কেন্দ্রীভূত হয়েছিল; অন্যদিকে পূর্ব অংশটি ছিল মূলত কৃষিপ্রধান এবং প্রাথমিক পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল (কবির ২০২২; মনিরুজ্জামান ১৯৮৮; জাহান ১৯৭২; আহমদ ১৯৬৭)।এর ফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ বৈষম্য এবং ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক শাসকগোষ্ঠীর আধিপত্যবাদী ও জাতিবিদ্বেষী মনোভাব রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় (টুর ২০১১; উমর ২০০৪)। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদারত্ব থেকে বঞ্চিত উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত এবং আঞ্চলিক বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নৃ-ভাষাগত স্বীকৃতি ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনগুলোই পূর্ববঙ্গের রাজনীতির মূল গতিপথ নির্ধারণ করে দেয় (কবির ২০২২)। এই কাঠামোগত বৈষম্যগুলো লাঘব করার লক্ষ্যেই মূলত পল্লি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছিল। এগুলোকে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ প্রশমিত করে মিত্র কেন্দ্রীয় সরকারকে টিকিয়ে রাখার পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল; একই সঙ্গে বিশ্বের দরবারে মার্কিন বলয়ে থাকার উন্নয়নমূলক ও গণতান্ত্রিক ‘লভ্যাংশ’ প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবেও দেখা হয়েছিল।
যুক্তি ও প্রমাণ
ভি-এআইডি পদ্ধতি তার ঘোষিত লক্ষ্যগুলো অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল,যদিও ফোর্ড ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা ‘জনপ্রশাসনে’ এর তথাকথিত সাফল্যের ওপর ইতিবাচক প্রলেপ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন (ক্লেম ১৯৫৪)। কেন্দ্রের পাকিস্তানি আমলারা আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেন, ‘…ভি-এআইডি গ্রামের বিভিন্ন গোষ্ঠী ও উপদলের গ্রামবাসীদের সাধারণ মঙ্গলের জন্য একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে,’ এবং এর ‘কাউন্সিল ও বিশেষায়িত উপকমিটিগুলো গ্রামবাসীকে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে গড়ে তুলেছে’ (মিনোচার হোমজি ১৯৬১)। অথচ ভি-এআইডি প্রশিক্ষণ এলাকা বা প্রকল্পগুলোর ওপর করা কোনো গবেষণাতেই এই দাবির সত্যতা মেলেনি। এই ইতিবাচক প্রচার ছিল মূলত ‘গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ’-এর আবহে নিজেদের মুখ রক্ষার একটি রাজনৈতিক কৌশলমাত্র। ১৯৫৪ সালের দিকেই র্যান্ডাল ক্লেম কেন্দ্রে বেসামরিক-সামরিক আমলাতন্ত্রের অগণতান্ত্রিক ক্ষমতা দখলকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। সে সময়ের ক্ষমতা-রাজনীতির অন্যতম কুশীলব জেনারেল ইস্কান্দার মির্জার প্রসঙ্গে নিউইয়র্কের ফাউন্ডেশন সদর দপ্তরে ক্লেমের পাঠানো বার্তায় বলা হয়: ‘[মির্জা] সরকারের অন্যতম যোগ্য ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত, যিনি পেশাদার রাজনীতিকদের ঘোর বিরোধী এবং যুক্তরাষ্ট্রের অকৃত্রিম বন্ধু…[পূর্ব পাকিস্তানের] উন্নয়ন সমস্যা সমাধানেও তিনি অত্যন্ত পারদর্শী (ক্লেম ১৯৫৪)।’ ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ভূমিধস বিজয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই মির্জা বামঘেঁষা যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন (কামাল ২০০৯; উমর ২০০৪)।যখন উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, যুক্তফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং প্রশাসনিক অকার্যকরতা চরম রূপ নেয়, তখন সেনাবাহিনী প্রধান এবং মার্কিন-পাকিস্তান সামরিক মৈত্রীর অন্যতম প্রধান রূপকার জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে মার্কিন–সমর্থিত এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন (ম্যাকমহন ১৯৫৪: অধ্যায় ৫)। তিনি অতি দ্রুত সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন এবং বৈদেশিক সহায়তা নিশ্চিত করে এমন এক শাসনকাল শুরু করেন, যা তাঁর দেশি-বিদেশি সমর্থকেরা (কু)খ্যাতভাবে ‘উন্নয়নের দশক’ হিসেবে প্রচার করেন।

১৯৬০-এর দশকে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে সাটন-বর্ণিত সেই ‘সমৃদ্ধির আশা’ জিইয়ে রাখাকেই গণতান্ত্রিক অনুশীলনের ভিত রচনার জন্য যথেষ্ট মনে করা হতো। আইয়ুব খান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং পাকিস্তানের ভেতরে ও বাইরে কর্মরত অনেক মার্কিন পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞের ধারণা ছিল অনেকটা এমনই (সাটন ২০০৫: ৪৬, ৬০-৬১)। আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে বিউপনিবেশায়ন যখন গতি লাভ করছিল এবং তৃতীয় বিশ্বে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা তুঙ্গে উঠছিল, তখন মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা অনুগত স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাগুলোর ওপর বাজি ধরছিলেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি তেমন শাসনও চাপিয়ে দিচ্ছিলেন। ব্রাজিল ও ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে শুরু করে পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত—এই স্বৈরতন্ত্রগুলোতে মার্কিন সমর্থনের নেপথ্যে কাজ করছিল দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ম্যাকার্থি-পরবর্তী মেরুকরণ এবং স্নায়ুযুদ্ধকালীন কঠোর দ্বিমুখী আদর্শিক সংঘাত। ফলস্বরূপ, যুদ্ধ-পরবর্তী শুরুর দিকের সেই উদার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাতি গঠনের বাগাড়ম্বর ও অনুশীলনগুলো ‘আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র’—এই নীতির ভিড়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। একটি হিতৈষী ও টেকনোক্র্যাটিক স্বৈরতন্ত্রের ধারণা তখন প্রবল হয়ে ওঠে (ইউএসএইড ১৯৫৪)।
পাকিস্তানের চেয়ে স্পষ্টভাবে এই চিত্র আর কোথাও দৃশ্যমান ছিল না। ফোর্ড ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি ইউজেন স্ট্যাপলস মন্তব্য করেছিলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমাদের রুচি অনুযায়ী আইয়ুব খানের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় কোনো নেতা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল… (স্ট্যাপলস ১৯৭১)।’ তবে ১৯৭০ সালে স্ট্যাপলসের এই স্মৃতিচারণা ছিল মূলত এক আন্তরিক বিলাপ; কারণ, তত দিনে পাকিস্তানজুড়ে গণ-অভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খানের সেই ‘হিতৈষী’ একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটেছে।
প্রশ্ন ওঠে, পাকিস্তানের এই তথাকথিত ‘উন্নয়নের দশকে’ আসলে কী ঘটেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পল্লি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ওপর আলোকপাত করা জরুরি। গ্রামীণ পূর্ব পাকিস্তানে ভূমিহীনতা ও ভূমির অতি-খণ্ডিতকরণ,অবকাঠামোগত জরাজীর্ণতা, বেকারত্ব এবং ঋণগ্রস্ততার মতো সমস্যাগুলো, যা ভি-এআইডি প্রকল্পের মাধ্যমে নিরসনের দাবি করা হয়েছিল, তা হয়নি। বরং প্রকৃতপক্ষে তা আরও ঘনীভূত হয়েছিল। উন্নয়নমূলক চিন্তাধারায় অর্থনৈতিক অগ্রগতি থেকে রাজনৈতিক গণতন্ত্রায়ণকে পৃথক করার বিষয়টি একটি ত্রুটিপূর্ণ বৈধকরণ প্রক্রিয়া তৈরি করেছিল,যেখানে সমবণ্টনের চেয়ে প্রবৃদ্ধিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল (আরেন্ডট ১৯৮৭)। কৃষি সংস্কারের মতো জটিল প্রশ্ন এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়গুলো ক্রমশ আড়ালে চলে যায়। ভি-এআইডির একটি শাখা, যা পরবর্তীকালে পল্লি প্রশাসনের ‘কেন্দ্রে’ পরিণত হওয়া কুমিল্লা একাডেমি—তার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এই গতিপ্রকৃতিকেই স্পষ্ট করে তোলে।
ভি-এআইডির সাবেক পরিচালক আখতার হামিদ খান ১৯৫০-এর দশকের শুরু থেকেই কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ম্যান্ডেট অনুযায়ী স্থানীয় ‘কৃষকদের প্রয়োজন’ নিরূপণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন (খান ১৯৮৩ক; ১৯৮৩খ)। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির বহিস্থ উপদেষ্টাদের সহায়তায় কৃষি সম্প্রসারণ পদ্ধতি এবং মাঠপর্যায়ের গবেষণার ওপর শিক্ষক, মাঠকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল প্রচেষ্টা চালানো হয়। এ প্রকল্পের প্রধান অর্থায়নকারী ছিল ফোর্ড ফাউন্ডেশন, যাদের সঙ্গে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমঝোতা স্মারক ছিল। ১৯৫৮ সাল নাগাদ এই পদ্ধতির ফলে স্থানীয় কৃষক,কারিগর, শিক্ষিত যুবক এবং গ্রামপর্যায়ের কর্মকর্তারা একাডেমির কর্মসূচিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি স্থানীয় ঋণ সমিতি (গ্যান্ট ১৯৬৩)।খানের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে প্রান্তিক চাষি ও স্বত্বভোগী প্রজারাই হলেন ‘প্রকৃত কৃষক…যাঁদের কাছ থেকেই বাজারে বিক্রয়যোগ্য উদ্বৃত্ত ফসল আসে’ (খান ১৯৭৩)। ঋণ সমিতি তাদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করত এবং বড় ভূস্বামীদের দূরে রাখার চেষ্টা করত। কারণ, এই অভিজাত গোষ্ঠী ‘স্বনির্ভর কৃষক’ হওয়ার চেয়ে মহাজন বা ব্যবসায়ী হওয়ার দিকেই বেশি আগ্রহী ছিল (খান ১৯৭৩)। ফলত প্রকৃত চাষিদের প্রয়োজন এবং ঋণের সহজ শর্ত নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই ঋণ সমিতি গঠিত হয়েছিল।

শুরুতে প্রকল্পটি একাডেমির কর্মীদের নিবিড় জনসংযোগের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাঁরা আশপাশের কৃষিভিত্তিক সম্প্রদায়ের স্থানীয় নেতাদের নিয়ে আসতেন তাঁদের সংকটগুলো শুনতে এবং ঋণ ও বাজারে প্রবেশাধিকারের মতো সমবায় প্রকল্পগুলোতে তাঁদের আগ্রহ যাচাই করতে (কুমিল্লা একাডেমি ১৯৫৯)। অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং ব্যক্তিক প্রচারের মাধ্যমে একটি সংহত ভিত্তি তৈরি হয় এবং থানা পর্যায়ে একটি কেন্দ্রীয় ঋণ সমিতি গঠিত হয় (টেপার ১৯৭৬)। গ্রাম পর্যায়ের বিভিন্ন সমিতির নেতারা নিয়মিত একাডেমিতে মিলিত হতেন। তাঁরা সদস্যদের পক্ষে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন—যেমন আমানত সংগ্রহ, নতুন ঋণ বিতরণ,বিনিয়োগ ও ভোগ্যপণ্যের জন্য সম্পদ একত্র করা এবং নবনির্মিত গুদামে উদ্বৃত্ত ফসল মজুদ করা (খান ১৯৮৩খ; ১৯৭৩; র্যাপার ১৯৬৩)। আমন ও আউশ ধান কাটার প্রধান মৌসুমে যখন বাজারে দাম কম থাকত, তখন এই গুদামজাতকরণ সুবিধা সদস্যদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। এর ফলে তাঁরা শুষ্ক মৌসুমে ভালো দামে ফসল বিক্রি করতে পারতেন। এই সভাগুলো সদস্যদের জন্য একাডেমির অন্যান্য কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগও করে দিত—যেমন বয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচি থেকে শুরু করে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও প্রযুক্তির বিস্তার (আলি ২০১৯; খান ১৯৮৩খ; ১৯৭৩; র্যাপার ১৯৬৩)। একাডেমিটি মূলত মাঠ পর্যায়ের একটি সাধারণ মঞ্চে পরিণত হয়েছিল, যেখানে সমস্যা বিনিময়, নতুন ধারণা ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে ‘অংশগ্রহণমূলক অ্যাকশন রিসার্চ’-এর প্রাথমিক রূপরেখা ফুটে উঠেছিল।



একাডেমির এই প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডগুলোই র্যাপারের কাছে অসাধারণ মনে হয়েছিল এবং তাঁর মনে এক ভিন্নধর্মী আশার সঞ্চার করেছিল। এটি কোনো নিছক ব্যক্তিগত সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা বা কেবল যান্ত্রিক প্রবৃদ্ধির ধারণা ছিল না; বরং এটি কৃষিভিত্তিক গণতন্ত্রের এক প্রকৃত সম্ভাবনা নির্দেশ করছিল,যেখানে সম্মিলিত সাংগঠনিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশাল কৃষক শ্রেণির আর্থসামাজিক সমস্যার সমাধান সম্ভব। খান এবং কুমিল্লা একাডেমির কর্মীরা ‘পল্লী উন্নয়নের’ এমন একটি বিকল্প পথ উন্মোচন করেছিলেন, যা প্রান্তিক ও বর্গা চাষিদের পক্ষে গ্রামীণ ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের আদর্শের অনেক কাছাকাছি ছিল—অন্তত র্যাপারের মতো যাঁরা চিন্তা করতেন তাঁদের কাছে। এই ক্ষেত্রে ঋণ সমবায় ছিল একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। ঋণপ্রাপ্তি এবং গুদামজাতকরণের ক্ষেত্রে ‘মধ্যস্বত্বভোগীদের’ প্রভাব হ্রাস পাওয়ায় সামাজিক ক্ষমতার একটি বিকল্প কেন্দ্র তৈরি হয়েছিল, যা কৃষকদের জীবিকা ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ছিল। র্যাপার অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে জানিয়েছিলেন যে১৯৬৩ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে গ্রাম পর্যায়ের ঋণ সমিতিগুলোর ‘সদস্য সংখ্যা ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে’ এবং ‘আমানত বেড়েছে ৬০ শতাংশ’ (র্যাপার ১৯৬৪)।
এভাবে একাডেমি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহকে কার্যকরভাবে ত্বরান্বিত করছিল। ঋণ সমিতির পাশাপাশি এসব কার্যক্রমের মধ্যে ছিল গভীর নলকূপ স্থাপন এবং রাস্তা ও খালের মতো বৃহৎ গণপূর্ত প্রকল্প। শেষেরটি বর্ষাকালে পানিনিষ্কাশন এবং শুষ্ক মাসে সেচ সুবিধার জন্য ছিল অপরিহার্য। ১৯৬২ সালে র্যাপার যখন কুমিল্লায় ছিলেন, তখন আইয়ুব খান সরকার এবং ইউএসএআইডি যৌথভাবে কুমিল্লা থানায় একটি বহুবর্ষজীবী গ্রামীণ গণপূর্ত কর্মসূচি চালু করেছিল। এর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মহীন শীত মৌসুমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি (গভার্নমেন্ট অব ইস্ট পাকিস্তান ১৯৬৩)। এই কর্মসূচিতে সহায়তা এসেছিল ‘পিএল–৪৮০’ গম হিসেবে এবং শ্রমিকদের মজুরির একটি অংশ সরাসরি খাদ্যশস্যের মাধ্যমে পরিশোধ করা হতো। যদিও এই সাহায্য মুদ্রাস্ফীতি রোধের কৌশল হিসেবে পরিকল্পিত ছিল, তবু এটি প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হয়নি এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণে তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয় (সোবহান ১৯৬৮)।

তবে সামগ্রিকভাবে একাডেমির কার্যক্রম নিয়ে সে সময় এক প্রবল উদ্দীপনা বিরাজ করছিল। ফোর্ড ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি এবং উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি কর্মকর্তারা কুমিল্লা প্রকল্পকে একটি ‘মডেল’ হিসেবে উন্নীত করেছিলেন, যা অন্য কোথাও অনুসরণের মাধ্যমে কৃষি আধুনিকায়নের একটি ‘গণতান্ত্রিক’ পথের সুফল হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি করেছিল (ফেয়ারচাইল্ড ১৯৬৩)।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যে অনেক বেশি জটিল ছিল, তা আর্থার র্যাপারের মতো নিবিড় পর্যবেক্ষকদের নজর এড়ায়নি। ‘ভি-এআইডি’ আমল থেকেই অনুপস্থিত ভূস্বামী এবং গ্রামীণ প্রভাবশালী গোষ্ঠী একাডেমির কার্যক্রমকে সন্দেহের চোখে দেখত। তাদের কাছে মনে হয়েছিল, একাডেমির লভ্য বৈদেশিক সম্পদ এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের সংগঠিত করার এই প্রয়াস তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্য ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে (কুমিল্লা একাডেমি ১৯৫৯)। ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর, ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামক একটি স্বৈরতান্ত্রিক প্রকল্পের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থাকে বেসামরিক রূপ দেওয়ার যে চেষ্টা আইয়ুব সরকার করেছিল, তার মূল ভিত্তিই ছিল গ্রামীণ প্রভাবশালীদের এই আশঙ্কা প্রশমিত করা।
নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে মরিয়া এই শাসনব্যবস্থা ভি-আইডি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর নেটওয়ার্ককে একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে স্থানীয় ভূস্বামী, জোতদার এবং গ্রামীণ মধ্যবিত্তের প্রভাবশালী অংশগুলোর কাছে বৈদেশিক সাহায্যের লভ্যাংশ পৌঁছে দিতে শুরু করে। এটি ছিল মূলত আইয়ুব খানের অনুগত একটি গোষ্ঠী তৈরি করার এবং নির্বাচনী গণতন্ত্রের একটি ছদ্মাবরণ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা—যেখানে ১৯৬২ সালের ফরমানি সংবিধান অনুযায়ী তথাকথিত ‘মৌলিক গণতন্ত্রীরা’ সরাসরি প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করবেন (উমর ২০২০)। তত দিনে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন কুমিল্লা একাডেমি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল প্রভাবক ও ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সমর্থনপুষ্ট হওয়ায়, ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ প্রকল্পের প্রচার ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার উদীয়মান অবকাঠামোর মধ্যে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয় (পাকিস্তান একাডেমি অব রুরাল ডেভেলপমেন্ট ১৯৬০)। আইয়ুব সরকার একাডেমির কর্মকাণ্ডকে ‘পল্লী উন্নয়ন’-এর প্রতি তাদের অঙ্গীকার হিসেবে প্রচার করলেও,বাস্তবে রাষ্ট্রের নীতি ও চর্চায় পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক নগরভিত্তিক শিল্পায়নই নিরঙ্কুশ অগ্রাধিকার পাচ্ছিল (খান ১৯৭৩)।
আখতার হামিদ খানের নেতৃত্ব এই প্রেক্ষাপটে সরকারের জন্য একটি অস্বস্তিকর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমত, ঋণ সমবায়গুলোর মাধ্যমে তিনি সামাজিক ক্ষমতার যে বিকল্প কেন্দ্র গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, তা সেই ‘পৃষ্ঠপোষক-মক্কেল’ (patron-client) সম্পর্কের ছাঁচে ফিট করছিল না, যা ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ প্রকল্প গ্রামীণ বিত্তবান, প্রভাবশালী এবং লুম্পেন-বুর্জোয়াদের মধ্যে নিশ্চিত করতে চেয়েছিল (খান ১৯৭৩)। দ্বিতীয়ত, আখতার হামিদ খানের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, তাঁর কৌমবাদী (communitarian) আদর্শ এবং মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ফোর্ড ফাউন্ডেশন মহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে সরকারের কাছে একজন ‘অনমনীয়’ বা অবাধ্য মিত্র হিসেবে চিত্রিত করেছিল। সম্ভবত এই কারণেই ১৯৬২ সালে সরকার তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে একাডেমি থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তুতিনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন (ফোর্ড ফাউন্ডেশন তারিখ নেই)।
ফলেসরাসরি নিয়ন্ত্রণের বদলে একাডেমির ‘প্রতীকী পুঁজি’আত্মসাৎ করার কৌশলটি পরিবর্তিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খানের মনোনীত গভর্নর গোলাম ফারুক খান পুরো প্রদেশে ঋণ সমিতিসহ একাডেমির কার্যক্রমগুলো দ্রুত সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন। কিন্তু আখতার হামিদ খান এবং মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির উপদেষ্টারা এতে আপত্তি জানান। তাঁরা জানতেন যেকুমিল্লার সমবায় সমিতির সাফল্য ছিল সুদীর্ঘ ও পরিশ্রমসাধ্য সাংগঠনিক প্রচেষ্টার ফল। তাঁদের কাছে এটি স্পষ্ট ছিল যে স্থানীয় কৃষিকাঠামোর জটিল গতিপ্রকৃতিকে কেবল প্রশাসনিক আদেশে ‘স্কেল-আপ’ বা অন্য কোথাও হুবহু অনুকরণ করা সম্ভব নয় (ফোর্ড ফাউন্ডেশন তারিখ নেই)।
এরই মধ্যে কুমিল্লা থানায় ঋণ সমিতির দ্রুত বিস্তারের ফলে এমন অনেক সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন, যাঁরা প্রকৃত চাষি ছিলেন না এবং যাঁদের স্বার্থ ছিল সাধারণ কৃষকদের পরিপন্থী। উদাহরণস্বরূপ, সমিতিতে ঢুকে পড়া বিত্তবান ও প্রভাবশালীরা ব্যক্তিগত লাভের আশায় একাডেমি প্রবর্তিত গভীর নলকূপ সেচ প্রকল্পগুলোকে প্রবলভাবে সমর্থন করতে শুরু করে। পুরো সমবায়টির সামষ্টিক মুনাফার চেয়ে পাম্প সরঞ্জাম আমদানি, ইজারা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবসায়িক সুযোগগুলো, যা মূলত উদ্বৃত্ত পুঁজির মালিকদের জন্যই উন্মুক্ত ছিল—তাদের কাছে অধিকতর আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এর অবধারিত ঝুঁকি ছিল দরিদ্র চাষি ও বর্গা চাষিদের ওপর নতুন ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা চাপিয়ে দেওয়া (খান ১৯৭৩; ফোর্ড ফাউন্ডেশন ১৯৬২)।

র্যাপার সমবায়কেন্দ্রিক এই ‘গোষ্ঠীগত কর্মকাণ্ডের’ শ্রেণিগত দ্বন্দ্বটি আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি কুমিল্লা একাডেমির এই সংকটকে প্রতিষ্ঠানের ‘কার্যকর অখণ্ডতা’ এবং ‘কর্মীদের সংহতি’ বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেন (র্যাপার ১৯৬৪)। তাঁর এই প্রশাসনিক ও নথিবদ্ধকরণমূলক ভাষার অন্তরালে আসলে কৃষি-গণতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া এবং স্নায়ুযুদ্ধকালীন কৃষি আধুনিকায়নের চূড়ান্ত লক্ষ্যের মধ্যকার বৈপরীত্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা লুকিয়ে ছিল। র্যাপার এর আগে মন্তব্য করেছিলেন, ‘বাঙালি গ্রামের আধুনিকায়ন তখনই শান্তিপূর্ণভাবে অর্জন করা সম্ভব, যখন গ্রামের স্বাভাবিক বিপ্লবী উপাদানগুলোকে উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা যাবে।’
কিন্তু সেখানে থাকার এক বছরের মধ্যেই র্যাপার এ বিষয়ে সন্দিহান হয়ে ওঠেন। একাডেমি এবং ঋণ সমিতিগুলোর ‘নেতৃত্ব হস্তান্তর’ নিয়ে তাঁর ভাবনাগুলো সেই অনিশ্চয়তাকেই প্রতিফলিত করে (র্যাপার ১৯৬৩)। র্যাপার আশঙ্কা করেছিলেন যে ক্ষমতার এই প্রাতিষ্ঠানিক হস্তান্তর যদি সঠিক সময়ে না ঘটে, তবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী কৃষক ও গ্রামীণ মধ্যবিত্তের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধবে—বিশেষ করে যারা সমবায়ের লভ্যাংশকে ব্যক্তিগতভাবে করায়ত্ত করতে চায়,তাদের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে।
এই পর্যবেক্ষণগুলো এমন এক সন্ধিক্ষণে করা হয়েছিল, যখন গ্রামীণ মধ্যবিত্তের একটি অংশ, বিশেষ করে মফস্সল শহরগুলোর শিক্ষিত যুবসমাজ কর্মসংস্থান ও সামাজিক উত্তরণের সুযোগের অভাবে ক্ষুব্ধ ছিল। তারা ক্রমেই সংগঠিত হয়ে ধর্মঘট ও জনসমাবেশের মাধ্যমে তাদের এই বঞ্চনার কথা জানান দিচ্ছিল (উমর ২০২০; র্যাপার ১৯৬৪)। অন্যদিকে ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ প্রকল্পের বদৌলতে গণপূর্ত কাজের ঠিকাদারি, আমদানির লাইসেন্স এবং সরকারি অনুদানের মাধ্যমে গ্রামীণ ধনীদের কাছে যে অঢেল সুযোগ-সুবিধা পৌঁছাচ্ছিল, তা এই সামাজিক অসন্তোষের আগুনে ঘি ঢালে। আখতার হামিদ খানের বিশ্লেষণে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উত্তেজনার মূল কারণ ছিল ‘দরিদ্র কৃষকের’ আর্থসামাজিক সংকটের প্রতি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের ক্রমাগত উদাসীনতা। কুমিল্লার সমবায়গুলোকে কেন্দ্র করে ‘ওপর’ এবং ‘নিচ’ থেকে সৃষ্ট এই রাজনৈতিক-সামাজিক টানাপোড়েন মূলত স্বার্থের রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র-নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্যকার এক জটিল ও বহুমুখী সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ।
উপসংহার
১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্মূল্যায়ন করতে গিয়ে সাটন স্বীকার করেন, মূল লক্ষ্য আসলে প্রকৃত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা ছিল না; বরং এর উদ্দেশ্য ছিল উদীয়মান উত্তর-ঔপনিবেশিক জনসমষ্টির মধ্যে বিশেষত রাজনৈতিক অভিজাত এবং তাঁদের গ্রামীণ-প্রান্তিক ক্ষমতার দালালদের সঙ্গে একটি ‘টেকসই সম্পর্ক’ গড়ে তোলা (পারমার ২০১২; সাটন ২০০৫: ৫৮)। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বলয়ে কুমিল্লার ‘মডেল’ এবং যে তথাকথিত হিতৈষী স্বৈরতন্ত্রের অধীনে এটি বিকশিত হয়েছিল, তা নিয়ে সৃষ্ট উদ্দীপনা ছিল একই সঙ্গে বিতর্কিত এবং ক্ষণস্থায়ী। যদিও ইউএসএআইডির কর্মকর্তারা কুমিল্লা সমবায়ের প্রশংসা করেছিলেন, তবু ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে তাঁরাই এর বিরুদ্ধে নেতিবাচক যুক্তি দাঁড় করাতে শুরু করেন (র্যাপার ১৯৬৪)।
১৯৫৮ সালে ভি-এআইডি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হওয়ার পর কৃষি আধুনিকায়নের পন্থা নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয়। ইউএসএআইডি উপদেষ্টা বেন ফার্গুসন কুমিল্লার প্রায় এক শ মাইল উত্তর-পশ্চিমে ময়মনসিংহের গ্রামগুলোতে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের প্রশিক্ষণের একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নেন (শুলার ১৯৭৫)। কুমিল্লার সমবায় প্রচেষ্টার পরিবর্তে ফার্গুসনের ময়মনসিংহের কার্যক্রমকে ইউএসএআইডির সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি সম্ভবত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যকার অভ্যন্তরীণ রেষারেষি ও মতপার্থক্যেরই ফল ছিল। তবে এর চেয়েও বড় বিষয় ছিল রাজনৈতিক-আদর্শিক বিভেদ, যা উভয় প্রকল্পের চর্চার ভিন্নতার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।
ফার্গুসনের কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ছিল বিত্তবান চাষি বা জোতদারদের মধ্যে পুঁজিবহুল চাষাবাদ পদ্ধতির প্রসার ঘটানো; যেখানে সম্পদ বা সুফল বণ্টনের চিন্তা ছিল অনুপস্থিত, যা প্রকারান্তরে আর্থসামাজিক বৈষম্যকেই উসকে দিচ্ছিল। অন্যদিকে কুমিল্লা সমবায়ের প্রবক্তাদের কাছে এই বৈষম্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যদিও প্রকল্পটির সাফল্যই পরবর্তী সময়ে একে রাজনৈতিক ‘সহযোজন’ (cooptation) এবং সম–অধিকারবাদী চর্চার মূলোৎপাটনের পথে ঠেলে দিয়েছিল।
একটি অস্থির প্রদেশে নিজের গ্রামীণ ক্ষমতার ভিত্তি সুসংহত করতে বদ্ধপরিকর এক স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার প্রভাবে কৃষি আধুনিকায়নের প্রায়োগিক পন্থা নিয়ে বিবিধ বিতর্কগুলো একটি অভিন্ন ক্ষেত্রে এসে মিলিত হয়েছিল। গ্রামীণ উন্নয়ন ভাবনার সেই সন্ধিক্ষণে, একরপ্রতি ফলন বৃদ্ধির বিষয়টি সম্পদ বণ্টনের উদ্বেগকে ছাপিয়ে যায়,অথবা বণ্টন বা ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিকে ফলন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৌণ বা ‘অন্তর্ভুক্ত’ (endogenous) হিসেবে দেখা হতে থাকে (কালাদার ২০১০)। রকফেলারদের অর্থপুষ্ট এবং কৃষি আধুনিকায়নে নিবেদিত জনহিতৈষী সংস্থা ‘অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল’-এর সহায়তায় একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক হাইব্রিড বীজ উদ্ভাবন করে, যা ছিল উচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাম্প-সেচ ও রাসায়নিক সারের মতো পুঁজিবহুল পদ্ধতির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। নরম্যান বোরলাগ ও আর্থার মোশারের মতো প্রভাবশালী কৃষিবিদ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং বেন ফার্গুসনের মতো মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কৃষকদের এই নতুন পদ্ধতি ও প্রযুক্তি গ্রহণে বাধ্য করতে রাষ্ট্রীয়-প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে এই পুরো প্রক্রিয়াটিকেই ‘সবুজ বিপ্লব’ হিসেবে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করা হয় (কালাদার ২০০৬)।
গ্রামীণ উন্নয়নের আদি ভাবনার ভেতরে যে গণতান্ত্রিক চেতনা ছিল এবং কুমিল্লা সমবায়ের মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়নের যে বৈষয়িক রূপ ছিল, তা মূলত প্রবাদপ্রতিম ‘হেগেলীয় প্যাঁচার’ (Owl of Minerva) মতোই প্রজ্ঞার এক বিলম্বিত প্রকাশে পরিণত হয়েছিল। পরিস্থিতির আকস্মিক পরিবর্তন গ্রামীণ উন্নয়নের গতিমুখ এবং রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাকে এমনভাবে বদলে দিয়েছিল যে ‘কৃষি গণতন্ত্রের’ আদর্শটি প্রান্তিক পর্যায়ে পর্যবসিত হয়। ক্রমবর্ধমান বৈষম্য নিরসন কিংবা ঘনীভূত হতে থাকা গ্রামীণ অসন্তোষের প্রতি সংবেদনশীল না হয়ে, বরং একটি সংকীর্ণ ও টেকনোক্র্যাটিক উন্নয়ন সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল; যার মূল ভিত্তি ছিল কেবল খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবার পরিকল্পনা (বন্ধ্যাকরণ ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ)। র্যাপারের উন্নয়ন ভাবনার এই পটপরিবর্তনের চূড়ান্ত পরিণতি দেখার জন্য কুমিল্লায় অবস্থান না করলেও আখতার হামিদ খান অন্যভাবে ছিলেন; অন্তত ১৯৭১ সালে বিশ্বায়িত স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবে এবং অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধের চাপে ‘পাকিস্তান পরীক্ষা’ নিজেই ধসে পড়া পর্যন্ত তিনি এর সাক্ষী হয়ে ছিলেন।


তথ্যসূত্র
অফনার ২০১৯।। Amy. C. Offner, Sorting Out the Mixed Economy: The Rise and Fall of Welfare and Developmental States in the Americas, Princeton University Press।
অ্যাডামসন ২০০৬।। Michael. R. Adamson, ‘The Most Important Single Aspect of Our Foreign Policy? The Eisenhower Administration, Foreign Aid, and the Third World’, The Eisenhower Administration, The Third World, and the Globalization of the Cold War, Kathryn. R. Statler and Andrew. L. Johns edited, Rowman & Littlefield Publishers Inc, pp. 47-72।
অ্যানিভাস ও মতিন ২০১৬।। Alexander Anievas and Kamran Matin (Eds.), Historical Sociology and World History: Uneven and Combined Development over the Longue Duree, Rowman & Littlefield International Ltd।
আরেন্ডট ১৯৮৭।। Heinz Wolfgang Arndt, Economic Development: The History of an Idea, University of Chicago Press।
আলি ২০১৫।। Kamran Asdar Ali, Communism in Pakistan: Politics and Class Activism 1947-1972, I.B. Tauris।
আলি ২০১৯।। Tariq Omar Ali, ‘Technologies of Peasant Production and Reproduction: The Post-Colonial State and Cold War Empire in Comilla, East Pakistan, 1960–70’, South Asia: Journal of South Asia Studies, vol. 42, no. 3, pp. 435-451।
আহমদ ১৯৬৭।। Kamruddin Ahmad, The Social History of East Pakistan, Pioneer Press।
ইউএসএইড ১৯৬৪।। USAID, Neal Report on Community Development, Philippines, East Pakistan, and India (Volume/Box R0876), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
ইনস ২০১৮।। Onur Ulas Ince, Colonial Capitalism and the Dilemmas of Liberalism, Oxford University Press।
ইমারওয়ার ২০১৫।। Daniel Immerwahr, Thinking Small: The United States and the Lure of Community Development, Harvard University Press।
উইন্ডেল ২০২২।। Aaron Windel, Cooperative Rule: Community Development in Britain’s Late Empire, University of California Press।
উমর ২০০৪।। Badruddin Umar, The Emergence of Bangladesh: Class Struggles in East Pakistan (1947-1958), Oxford University Press।
উমর ২০২০।। Badruddin Umar, The Emergence of Bangladesh: Part Two 1958-1971, Bangala Gobeshona।
কফম্যান ১৯৮২।। Burton Kaufman, Trade and Aid: Eisenhower’s Foreign Economic Policy, 1953-61, Johns Hopkins University Press।
কবির ২০২২।। Nurul Kabir, Birth of Bangladesh: The Politics of History and the History of Politics, Samhati Prakashan।
কামাল ২০০৯।। Ahmed Kamal, State Against the Nation: The Decline of the Muslim League in Pre-Independence Bangladesh, 1947-1954, University Press Ltd।
কালাদার ২০০৬।। Nick Cullather, ‘The Target Is the People: Representations of the Village in Modernization and US National Security Doctrine’, Cultural Politics, vol. 2, no. 1, pp. 29-48।
কালাদার ২০১০।। Nick Cullather, The Hungry World: America’s Cold War Battle against Poverty in Asia, Harvard University Press।
কুমিল্লা একাডেমি ১৯৫৯।। Comilla Academy, Interviews with ‘Kriti Krishaks/Enlightened Farmers’ (Volume/Box Reel 0861), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
কুপার ২০০৫।। Frederick Cooper, Colonialism in Question, University of California Press।
ক্লেম ১৯৫৪ক।। Randall T. Klemme, Letter from Randall T. Klemme to John B. Howard, April 15 (Volume/Box Reel 0861), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
ক্লেম ১৯৫৪খ।। Randall T. Klemme, Internal Memo, June 30 (Volume/Box Reel 3891), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
ক্লেম ১৯৫৪গ।। Randall T. Klemme, Report on East Pakistan visit, July 14-26 (Volume/Box Reel 3891), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
খান ১৯৭৩।। Akhtar Hameed Khan, The Comilla Projects – A Personal Account (Address in Addis Ababa, Box 21), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
খান ১৯৮৩ক।। Akhtar Hameed Khan, The Works of Akhter Hameed Khan: Rural Works and the Comilla Cooperative (Vol. 1), Bangladesh Academy for Rural Development।
খান ১৯৮৩খ।। Akhtar Hameed Khan, The Works of Akhter Hameed Khan: Rural Development Approaches and the Comilla Model (Vol. 2), Bangladesh Academy for Rural Development।
খান ১৯৯৯।। Mushtaq Khan, ‘The Political Economy of Industrial Policy in Pakistan 1947-1971’ (Working Paper), SOAS, University of London, https://eprints.soas.ac.uk/9867/1/Industrial_Policy_in_Pakistan.pdf।
গভার্নমেন্ট অব ইস্ট পাকিস্তান ১৯৬৩।। Government of East Pakistan, Report on Rural Works Program through Basic Democracies (Volume/Box R0877), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
গিলবার্ট ২০১৫।। Jess Gilbert, Planning Democracy: Agrarian Intellectuals and the Intended New Deal, Yale University Press।
গেটাচিউ ২০১৯।। Adom Getachew, Worldmaking after Empire: The Rise and Fall of Self-Determination, Princeton University Press।
গ্যান্ট ১৯৬৩।। George Franklin Gant, East Pakistan visit report (Volume/Box Reel R0877), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
চ্যাটার্জি ১৯৯৩।। Partha Chatterjee, ‘Development Planning and the Indian State’, The State and Development Planning in India, Terence J. Byres (Ed.), Oxford University Press, pp. 51-72।
জাহান ১৯৭২।। Rounaq Jahan, Pakistan: Failure in National Integration, Columbia University Press।
টেপার ১৯৭৬।। Elliot L. Tepper, ‘The Administration of Rural Reform: Structural Constraints and Political Dilemmas’, Rural Development in Bangladesh and Pakistan, R. D. Stephens, H. Alavi and P. J. Bertocci (Eds.), The University of Hawaii Press, pp. 29-59।
টুর ২০১১।। Saadia Toor, The State of Islam: Culture & Cold War Politics in Pakistan, Pluto Press।
পাকিস্তান একাডেমি অব রুরাল ডেভেলপমেন্ট ১৯৬০।। Pakistan Academy of Rural Development, Annual Evaluation Report (Volume/Box Reel R0877), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
পারমার ২০১২।। Inderjeet Parmar, Foundations of the American Century: The Ford, Carnegie and Rockefeller Foundations in the Rise of American Power, Columbia University Press।
প্যাটেল ২০১৬।। Kiran Klaus Patel, The New Deal: A Global History, Princeton University Press।
ফেয়ারচাইল্ড ১৯৬৩।। Harold William Fairchild, Monthly Report to Richard Niehoff (MSU), February 2 (Volume/Box Reel R3993), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
ফোর্ড ফাউন্ডেশন ১৯৫৫।। Ford Foundation, The Five-Year Plan for V-AID of Pakistan 1955-1960 (Reel 3891), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
ফোর্ড ফাউন্ডেশন ১৯৬২।। Ford Foundation, Comilla Coop Program (Volume/Box R0876), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
বারম্যান ১৯৮৩।। Edward H. Berman, The Influence of the Carnegie, Ford, and Rockefeller Foundations on American Foreign Policy: The Ideology of Philanthropy, SUNY Press।
বোস ১৯৯৭।। Sugata. Bose, ‘Instruments and Idioms of Colonial and National Development: India’s Historical Experience in Comparative Perspective’, International Development and the Social Sciences: Essays on the History and Politics of Knowledge, F. Cooper and R. M. Packard (Eds.), University of California Press, pp. 45-63।
মনিরুজ্জামান ১৯৮৮।। Talukder Maniruzzaman, The Bangladesh Revolution and Its Aftermath, University Press Ltd।
মাজারি ২০০৬।। Louis Mazzari, Southern Modernist: Arthur Raper from the New Deal to the Cold War, LSU Press।
মিনোচের হোমজি ১৯৬১।। H. B. Minocher Homji, V-AID Terminal Report (Volume/Box Reel 0867), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
মিলফোর্ড ও ম্যাকক্যান ২০২২।। Ismay Milford and Gerard McCann, ‘African Internationalisms and the Erstwhile Trajectories of Kenyan Community Development: Joseph Murumbi’s 1950s’, Journal of Contemporary History, vol. 57, no. 1, pp. 111-135।
মিসকোভিচ, ফিসার-টিন ও বোসকোভস্কা ২০১৪।। Natasa Miskovic, Herald Fischer-Tiné and Nada Boskovska (Eds.), The Non-Aligned Movement and the Cold War: Delhi-Bandung-Belgrade, Routledge।
ম্যাকমহন ১৯৯৪।। Robert J. McMahon, The Cold War on the Periphery: The United States, India, and Pakistan, Columbia University Press।
রাঘবন ২০১৮।। Srinath Raghavan, Fierce Enigmas: A History of the United States in South Asia, Basic Books।
র্যাপার ১৯৬৩।। Arthur Franklin Raper, Reflections on Comilla (Volume/Box Reel R3993), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
র্যাপার ১৯৬৪।। Arthur Franklin Raper, Monthly Report, September (Volume/Box Reel R3993), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
র্যাপার ১৯৭০।। Arthur Franklin Raper, Rural Development in Action: The Comprehensive Experiment in Comilla, East Pakistan, Cornell University Press।
রেইলি ২০১৪।। Dylan Riley, ‘Southern Questions’, New Left Review, no. 85 (Jan-Feb), pp. 147-160।
শুলার ১৯৭৫।। Alexandrina Shuler, ‘A Legend in His Own Time’, USAID, War on Hunger, pp. 18-21।
শ্রেডার ২০১৬।। Stuart Schrader, ‘To Secure the Global Great Society: Participation in Pacification’, Humanity: An International Journal of Human Rights, Humanitarianism, and Development, vol. 7, no. 2, pp. 225-253।
সাউদার্ন ১৯৫৩।। J. H. Southern, Memo to Staff (Volume/Box Reel 3891), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
সাটন ২০০৫।। Francis X. Sutton, ‘Nation-Building in the Heyday of the Classic Development Ideology: Ford Foundation Experience in the 1950s and 1960s’, Nation-Building: Beyond Afghanistan and Iraq, F. Fukuyama (Ed.), Johns Hopkins University Press, pp. 42-63।
সিনহা ২০০৮।। Subir Sinha, ‘Lineages of the Developmentalist State: Transnationality and Village India, 1900–1965’, Comparative Studies in Society and History, vol. 50, no. 1, pp. 57-90।
সোবহান ১৯৬৮।। Rehman Sobhan, Basic Democracies Works Programme and Rural Development in East Pakistan, Oxford University Press।
স্ট্যাপলস ১৯৭১।। E. Staples, Internal Report (Box 2, Office Files of Tim Rice), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
স্যাকলি ২০১১।। Nicole Sackley, ‘The Village as Cold War Site: Experts, Development, and the History of Rural Reconstruction’, Journal of Global History, vol. 6, no. 3, pp. 481-504।
স্যাকলি ২০১৩।। Nicole Sackley, ‘Village Models: Etawah, India, and the Making and Remaking of Development in the Early Cold War’, Diplomatic History, vol. 37, no. 4, pp. 749-778।
হথর্ন ১৯৮৭।। Geoffrey Hawthorn, Enlightenment & Despair: A History of Social Theory (2nd ed.), Cambridge University Press।
হার্ট ২০১০।। Gillian Hart, ‘D/Developments after the Meltdown’, Antipode, vol. 41, no. s1, pp. 117-141।
হোমস ১৯৫৪।। Horace Holmes, Letter from Horace Holmes to Ahsan-Uddin, June 16 (Volume/Box Reel 3891), Ford Foundation Records, Rockefeller Archive Center।
লেখক পরিচিতি
মুশাহিদ হোসেন একজন শিক্ষক ও গবেষক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটি থেকে উন্নয়ন সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি এবং নিউইয়র্কের বিংহ্যামটন ইউনিভার্সিটি ও নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটি থেকে সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বাংলাদেশ এবং বৃহত্তর পরিসরে গ্লোবাল সাউথের পুঁজিবাদী উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের অতীত ও বর্তমান রূপের মধ্যকার সম্পর্কটিই মূলত তার গবেষণার মূল বিষয়। এছাড়া উপনিবেশ থেকে মুক্তির ইতিহাস, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠন এবং সামাজিক তত্ত্বের নানা বিষয় তার লেখায় ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে।



