রাষ্ট্র বাংলাদেশের টেকসই স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থে ডলার-ডোনারনির্ভর সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব ও তার বহুমাত্রিক রূপ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা আজ সময়ের দাবি। এই প্রেক্ষাপটে বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তার মানবিক, প্রগতিশীল ও বৈষম্যবিরোধী দিকগুলো নতুনভাবে সমাজে বিস্তার লাভ করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘ দুই শতাব্দীর শোষণ-নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে মাত্র ৭৮ বছর আগে। স্বাধীনতার জন্য কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে শুরু করে সমাজের নানা স্তরের মানুষ অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেন। অগণিত মানুষের আত্মদান ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই মুক্তির পথ নির্মিত হয়েছে।
সেই সময়ের রাজনৈতিক সংগ্রাম শুধু রাজপথেই সীমাবদ্ধ ছিল না; মানুষের মনন, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাও ছিল মুক্তির আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গণসঙ্গীত, কবিতা, নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর গান ও কবিতার মাধ্যমে শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামী চেতনা সৃষ্টি করেছিলেন।
আজ আবারও মনে হচ্ছে, নাগরিক সমাজের একাংশ সুবিধাবাদ ও নীরবতার সংস্কৃতিতে বন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি স্বার্থগোষ্ঠী, এনজিও, ডোনারনির্ভর প্রতিষ্ঠান এবং নানা প্রভাববলয় সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে সক্রিয়। ফলে জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নতুন করে সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।
ইতিহাস বলে, বিদেশি প্রভাব ও নির্ভরতার প্রকৃত রূপ অনেক সময় দেরিতে প্রকাশ পায়। তখন পর্যন্ত রাষ্ট্র ও জাতি নানা ক্ষতির মুখোমুখি হয়। তাই জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।
এই বাস্তবতায় সাংস্কৃতিক জাগরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণসঙ্গীত, নাটক, সাহিত্য, শিল্পকলা ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাংস্কৃতিক অঙ্গসংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
একসময় বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা জনজীবনের বাস্তবতার সঙ্গে পর্যাপ্ত সংযোগ রক্ষা করতে পারেনি। ফলে তাদের প্রভাবও সীমিত হয়ে পড়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে। বরং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্য, করপোরেট আধিপত্য এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার রাজনীতির বাস্তবতায় সমাজতান্ত্রিক চিন্তার কিছু মৌলিক মূল্যবোধ আজও প্রাসঙ্গিক।
বিশ্বের অনেক উন্নত রাষ্ট্র সরাসরি সমাজতান্ত্রিক না হলেও সামাজিক নিরাপত্তা, কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিস্তারের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক চিন্তার কিছু মৌলিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। ফলে ধনতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার নানা উদ্যোগ দেখা যায়।
বাংলাদেশেও নতুন বাস্তবতার আলোকে বামপন্থী রাজনীতিকে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। পুরোনো স্লোগান বা কাঠামোর পুনরাবৃত্তি নয়; বরং দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আধুনিক, মানবিক ও গণমুখী রাজনৈতিক দর্শন গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদী রাজনীতির বিকল্প হিসেবে যুক্তিবাদী, মানবিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি। এই ক্ষেত্রে বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান বাংলাদেশের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—
প্রথমত, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র সংরক্ষণ করা।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম—সবখানেই নাগরিক দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের চর্চা জোরদার করতে হবে।
আজ প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তবুদ্ধি, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা। গণসঙ্গীত, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি মানবিক, বৈষম্যহীন ও সচেতন সমাজ গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির সামনে তাই নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা যদি সময়ের বাস্তবতা উপলব্ধি করে নতুন চিন্তা, নতুন ভাষা ও নতুন সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারে, তাহলে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।
সময়ের এই সন্ধিক্ষণে প্রয়োজন মানুষের বিবেক, বোধ ও চিন্তার জাগরণ। আর সেই জাগরণের অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে সংস্কৃতি, গণসঙ্গীত এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






