
তেহরান,২৬ সেপ্টেম্বর- ইরানের সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘শাস্তিমূলক পদক্ষেপ’ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।
আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি এ কথা বলেছেন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মোহেব্বি দাবি করেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরান বিজয়ী হয়েছেিসির মুখপাত্রের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা ছিল এবং তেহরান এখন সেই বিজয়কে ‘স্থায়ী কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতায়’ রূপান্তর করছে।
তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখাকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরান কবে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ আবার খুলবে, সে বিষয়ে তেহরান এখনও নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র
আইআরজিসির মুখপাত্রের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু সামরিক অভিযান চালিয়েও ওয়াশিংটন সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।
মোহেব্বি বলেন, “হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর একটি। কিন্তু আগ্রাসনের সময় তারা সেই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনী থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিকে ‘কয়েক ঘণ্টার জন্যও’ খোলা রাখতে পারেনি।
মোহেব্বির ভাষায়, “বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনী থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র কয়েক ঘণ্টার জন্যও হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে সক্ষম হয়নি।”
হরমুজ ঘিরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র টানাপোড়েন
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এই নৌপথ দিয়ে শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা সীমিত করে দেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব তেলের দাম, জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়ছে।
ইরানের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালি আবার খোলার বিষয়ে শর্তসাপেক্ষ প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। তেহরানের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমানো এবং ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ প্রত্যাহার করলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নৌপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে একই সময়ে আইআরজিসির সর্বশেষ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত হরমুজকে কেন্দ্র করে চাপ অব্যাহত রাখার অবস্থানেই রয়েছে তেহরান।
বিজয়কে স্থায়ী প্রতিরোধে রূপান্তর
আইআরজিসির মুখপাত্রের বক্তব্যে সামরিক বিজয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
মোহেব্বি বলেন, ইরান সাম্প্রতিক যুদ্ধের বিজয়কে ‘স্থায়ী কৌশলগত প্রতিরোধে’ রূপান্তর করছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে আরও বড় ঝুঁকি ও ব্যয়ের মুখে ফেলার সক্ষমতা তৈরি হবে—এমন বার্তাই তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তবে আইআরজিসির এই দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রেস টিভি ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এবং তাদের প্রতিবেদনে দেওয়া বক্তব্য মূলত আইআরজিসির নিজস্ব অবস্থানকে তুলে ধরে।
সাত শর্ত ঘিরে নতুন অচলাবস্থার আশঙ্কা
ইরানের সাতটি শর্ত কী কী—আইআরজিসির মুখপাত্রের উদ্ধৃত এই প্রতিবেদনে তার বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। তবে তেহরান সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কমানো, অবরোধ প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মতো বিষয়কে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে সামনে এনেছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়কে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরছে।
ফলে দুই পক্ষের অবস্থান এখনও অনেক দূরে রয়েছে। একদিকে ইরান হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের কৌশলগত চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার ওপর জোর দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে আইআরজিসির সর্বশেষ বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
এস এম/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬




