সরকারি হাসপাতালের ল্যাব: পরিচালনায় নতুন ভাবনার সময় কি এসেছে? | চ্যানেল আই অনলাইন

সরকারি হাসপাতালের ল্যাব: পরিচালনায় নতুন ভাবনার সময় কি এসেছে? | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যগুলোর একটি হলো—রোগী চিকিৎসকের কাছে যান সরকারি হাসপাতালে, কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য চলে যান বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এমনকি জাতীয় বিশেষায়িত হাসপাতাল—প্রায় সর্বত্রই এই চিত্র। সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসক দশটি পরীক্ষা লিখে দিলে, হাসপাতালের ল্যাবে হয়তো দুটি বা তিনটি পরীক্ষা করা যায়। বাকিগুলোর জন্য রোগীকে বাইরে যেতে হয়। বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে দেওয়া হয়। ফলে চিকিৎসা সরকারি হলেও রোগ নির্ণয় হয়ে ওঠে বেসরকারিনির্ভর।

প্রশ্ন হলো, কেন এই বাস্তবতা? কারণগুলো বহুদিনের পরিচিত। কোথাও আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, কোথাও কোটি টাকার যন্ত্র বছরের পর বছর বিকল। কোথাও রিএজেন্ট নেই, কোথাও যন্ত্র চালানোর প্রশিক্ষিত জনবল নেই। আবার কোথাও যন্ত্র আছে, কিন্তু নিয়মিত ক্যালিব্রেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহের জটিলতা, জনবল সংকট এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা মিলিয়ে ল্যাবসেবা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর খেসারত দেন রোগীরা।

এর বিপরীতে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো কেন তুলনামূলকভাবে কার্যকর? কারণ তাদের ব্যবসা নির্ভর করে সেবার ধারাবাহিকতার ওপর। যন্ত্র বিকল থাকলে রোগী অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাবে। তাই যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, রিএজেন্টের মজুত, প্রশিক্ষিত জনবল এবং মান নিয়ন্ত্রণে তারা নিয়মিত বিনিয়োগ করে। সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যে একই মান বজায় রাখে, তা নয়; তবু পরিচালন দক্ষতার দিক থেকে তারা সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে।

এই বাস্তবতায় একটি নীতিগত প্রশ্ন সামনে আসে। সরকার কি সরকারি হাসপাতালের ল্যাবরেটরির মালিকানা নিজের কাছে রেখে পরিচালনার দায়িত্ব চুক্তিভিত্তিকভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে?

এটি কোনো বেসরকারিকরণ নয়। হাসপাতাল, ভবন, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর মালিক থাকবে রাষ্ট্র। কিন্তু নির্ধারিত মানদণ্ডে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান ল্যাব পরিচালনা করবে। তারা যন্ত্র সচল রাখবে, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করবে, রিএজেন্ট সরবরাহ নিশ্চিত করবে এবং নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষার ফল দেবে। পরীক্ষার মূল্য সরকার নির্ধারণ করবে। আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হবে, অন্য অংশ পরিচালন ব্যয় ও চুক্তি অনুযায়ী সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান পাবে।

এমন মডেলকে অনেক দেশ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP)-এর আওতায় বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতেও হাসপাতাল নির্মাণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু সেবায় অংশীদারিত্বের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে ল্যাব ব্যবস্থাপনায়ও এমন একটি মডেল নিয়ে নীতিগত আলোচনা অযৌক্তিক নয়।

তবে এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা। স্বাস্থ্যসেবা কখনোই শুধু মুনাফার বাজার হতে পারে না। নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অতিরিক্ত ফি, নিম্নমানের রিএজেন্ট ব্যবহার কিংবা রোগী শোষণের ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই এই মডেলের সাফল্য নির্ভর করবে পরিচালকের চেয়ে নিয়ন্ত্রকের সক্ষমতার ওপর। সরকার যদি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফলের বদলে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।

তাই যেকোনো সিদ্ধান্তের আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষার সর্বোচ্চ মূল্য সরকার নির্ধারণ করবে। দরিদ্র রোগীদের জন্য বিদ্যমান ভর্তুকি বহাল থাকবে। প্রতিটি পরীক্ষার তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন নিরীক্ষা হবে। সেবার মান বা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে তাৎক্ষণিক আর্থিক জরিমানা, এমনকি চুক্তি বাতিলের ক্ষমতাও সরকারের হাতে থাকতে হবে।

সরকারি হাসপাতালের ল্যাবরেটরি কেবল একটি বিভাগ নয়; এটি চিকিৎসার ভিত্তি। ভুল রোগ নির্ণয় মানে ভুল চিকিৎসা, আর সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যন্ত্র কিনে সেগুলো অচল ফেলে রাখার চেয়ে রোগীর জন্য কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রের কাজ সব সেবা নিজ হাতে পরিচালনা করা নয়; রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকের জন্য মানসম্পন্ন, সাশ্রয়ী ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করা। সেই সেবা যদি নতুন কোনো পরিচালন কাঠামোর মাধ্যমে আরও দক্ষতার সঙ্গে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে তা নিয়ে খোলামেলা জাতীয় আলোচনা শুরু হওয়াই উচিত। কারণ রোগীর কাছে বিতর্কের চেয়ে বড় বিষয় একটাই—হাসপাতালেই যেন সব পরীক্ষা হয়, দ্রুত হয়, সঠিক হয় এবং অতিরিক্ত ভোগান্তি ছাড়াই হয়।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Scroll to Top