দৈনিক মানবজমিনের সৌজন্যে

চ্যানেল আই’তে আমি যে রুমটাতে বসি, সে রুমটায় থরে থরে সাজানো ছোট-বড় নানারকম পুতুল। অনেকেই এই পুতুলের প্রতি আকৃষ্ট হন। আবার পছন্দমতো পুতুল চেয়ে নেন। অনেক সময় আমি নিজেই উপহার হিসেবে পুতুল দিই। কারও বাড়িতে ছেলেমেয়ে কিংবা নাতি-নাতনিও রয়েছে। এসব পুতুল উপহার পেয়ে সবাই খুশি হন। অনেকে তার শৈশবে ফিরে যান। ভেতরে ভেতরে আমরা সবাই আসলে শিশু। আমাদের ভেতরে শিশু বসবাস করে। মনে আছে আমরা যখন কচিকাঁচার মেলা করতাম তখন একটা সোনালি দিন ছিল আমাদের। এক আনন্দময় শৈশব পার করেছি আমরা। সেই তুলনায় এখনকার শিশুরা কিন্তু অতটা সুযোগ পায় না। যদিও প্রযুক্তির দিক দিয়ে তারা এগিয়ে কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে হয়তো আমাদের ছেলেবেলাকেই এগিয়ে রাখবো। এখনকার বাচ্চারা সেই খুব সকালে একগাদা বই নিয়ে স্কুলে যায় আবার বিকালে ফিরে কোচিং, বাড়ির পড়া, স্কুলের পড়া-খেলাধুলার সময় কোথায়! কিছু ছেলেমেয়ে শিশু একাডেমিতে যাচ্ছে নাচ, গান শিখছে। কিন্তু তার পরিমাণ একেবারেই কম। শ্রেণি শিক্ষার পাশাপাশি আমাদের বাচ্চাদেরকে অন্যান্য বই পড়তে আগ্রহী করে তুলতে হবে।
বাচ্চারা এখন মোবাইলের প্রতি খুবই আসক্ত। যদি পর্যাপ্ত খেলাধুলায় তাদেরকে আগ্রহী করে তোলা যায় তাহলে মোবাইল আসক্তি অনেকটাই কমে যাবে। বাচ্চারা এখন নানারকম বিপজ্জনক গেমস-এ আসক্ত হয়ে পড়ছে। প্রকৃতি থেকে জ্ঞান আহরণের মতো আর কোনো জ্ঞান নেই। শিশুরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক, নেতৃত্বদানকারী এবং সমাজের চালিকাশক্তি। তাই শিশুদের সুস্থ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমগ্র সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার শুরু হয় আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সপ্তাহ। আর ২০শে নভেম্বর আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দিবস পালিত হয়।
শিশুর অধিকার বলতে বোঝায় প্রতিটি শিশুর বেঁচে থাকা, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা লাভ, নিরাপত্তা, মতপ্রকাশ, খেলাধুলা ও বিনোদন এবং বৈষম্যহীনভাবে মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের অধিকার। পৃথিবীর প্রতিটি শিশু, তার ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, আর্থিক অবস্থা কিংবা সামাজিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, সমান অধিকার পাওয়ার দাবিদার।
১৯৮৯ সালের ২০শে নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শিশু অধিকার সনদ (Convention on the Rights of the Child) গ্রহণ করে। এই সনদ শিশুদের মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক দলিল। এর মাধ্যমে বিশ্বের দেশগুলো শিশুদের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও বিকাশ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার করে।
পরবর্তীকালে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই সনদ অনুমোদন এবং শিশু অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
তবে বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বহু শিশু এখনো তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, নির্যাতন, পাচার, অপুষ্টি, শিক্ষাবঞ্চনা এবং নানা ধরনের বৈষম্য শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। যুদ্ধ, সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও শিশুদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। অনেক শিশু নিরাপদ বাসস্থান, পর্যাপ্ত খাদ্য ও চিকিৎসার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত।
বাংলাদেশেও শিশু অধিকার রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, শিশুমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি এবং শিশু সুরক্ষায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। তবু শিশুশ্রম, পথশিশু, বাল্যবিবাহ, অপুষ্টি, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া এবং শিশু নির্যাতনের মতো সমস্যা এখনো আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। আমি যতদূর জানি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নানাভাবে শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এটা অবশ্যই ভালো দিক। গুলিস্তান কিংবা রমনা পার্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা এসে বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখায় তাদের কাছ থেকেও আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে।
শিশু অধিকার রক্ষায় পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শুধু পড়াশোনায় ভালো করার জন্য চাপ না দিয়ে তার মতামত, অনুভূতি ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে। শারীরিক ও মানসিক শাস্তির পরিবর্তে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সমাজকে শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্মত ও নিরাপদ শিক্ষা, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাদ্য এবং সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু নির্যাতন, পাচার, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তির এই যুগে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি আমাদের দায়িত্ব ও অঙ্গীকার স্মরণ করিয়ে দেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। প্রতিটি শিশুকে তার অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে এবং বড়দেরও বুঝতে হবে যে, শিশুর প্রতি সহানুভূতি দেখানো যথেষ্ট নয়, তার অধিকার নিশ্চিত করাই মূল কথা।
একটি শিশুর হাসি, স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে নিরাপদ রাখা মানেই একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা। তাই আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দিবসে আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি, যেখানে কোনো শিশু দারিদ্র্য, নির্যাতন, বৈষম্য বা অবহেলার কারণে তার শৈশব হারাবে না। প্রতিটি শিশু শিক্ষা, নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও মর্যাদা নিয়ে বেড়ে উঠবে- এই হোক আমাদের প্রত্যয়।
আমাদের যেন আর বলতে না হয়-‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
