ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক চাপকে প্রথাগতভাবে কেবল কৌশলগত প্রতিরোধ, সামরিক উত্তেজনা বা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও পারমাণবিক ঝুঁকির মতো বস্তুগত মাপকাঠিতে বিশ্লেষণ করা হয়। ভূ-রাজনৈতিক এই হিসাব-নিকাশগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন আমাদের শেখায় যে, ক্ষমতার লড়াই কেবল অস্ত্রের ঝনঝনানিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্যেরও লড়াই।
ইরান কীভাবে এই প্রবল বাহ্যিক চাপের মুখে টিকে থাকতে পারে, তা বুঝতে হলে আমাদের সামরিক সমীকরণের বাইরে গিয়ে সেই আদর্শিক ও নৈতিক জগতের দিকে তাকাতে হবে, যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রটি ক্ষমতা, ক্ষতি এবং সর্বোপরি নিজ অস্তিত্বের মূল্যায়ন করে। এটি কেবল আক্রমণের শিকার হওয়া কোনো সাধারণ রাষ্ট্র নয়; বরং এমন এক রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো, যার ভিত্তি প্রোথিত রয়েছে বৃহত্তর কল্যাণে চরম আত্মত্যাগ এবং প্রতিরোধের অবিচল আদর্শের ওপর। যুদ্ধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে হয় না, এটি মূল্যবোধ দিয়েও লড়া হয়। আর রাষ্ট্রের বয়ানে যখন আত্মোৎসর্গ একটি পবিত্র রূপ পায়, তখন সেই বিশ্বাস নিজেই একটি অজেয় রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত হয়।
নির্দিষ্ট কিছু হামলায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতাদের প্রাণহানির মতো বড় ধরনের সংকটের পরও বোমাবর্ষণের মুখে ইরানিরা যেভাবে রাষ্ট্র-সমর্থিত শোক বা জমায়েতের আয়োজন করে, তার একটি গভীর তাত্ত্বিক অর্থ রয়েছে। এই শাসনব্যবস্থার প্রতি অনুগত বাহিনীগুলোর মধ্যে এমন অসংখ্য সদস্য রয়েছেন, যারা নিজেদের আদর্শের জন্য চরম আত্মোৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
এটি প্রমাণ করে যে, সামরিক আগ্রাসন হয়তো রাষ্ট্রটিকে সেভাবে দুর্বল করতে পারবে না, যেভাবে এর প্রতিপক্ষরা প্রত্যাশা করে। উল্টো, বাইরের এই আঘাত রাষ্ট্রের সেই প্রতীকী ও নৈতিক শক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, যা দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করার সুযোগ করে দেয়।
শুরু থেকেই এই রাষ্ট্রকাঠামো নিজেকে কেবল একটি আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি নৈতিক প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এই রাজনৈতিক দর্শনে নিপীড়নের শিকার হওয়া মানেই পরাজয় নয়; বরং কষ্টভোগকে সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। আর বৃহত্তর আদর্শের জন্য জীবন উৎসর্গ করার ধারণাকে এখানে কোনো গৌণ বিষয় হিসেবে দেখা হয় না; এটি তাদের কাঠামোগত অস্তিত্বের মূলভিত্তি।
বাইরের পৃথিবীর কাছে যা নিছক ধ্বংসযজ্ঞ, এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতরে তা সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে অনূদিত হয়। যেখানে মৃত্যু বা ক্ষতি নিজেই রাজনৈতিকভাবে এক নতুন শক্তির জন্ম দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের কৌশল ক্রমশই টিকে থাকা এবং প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করার দিকে এগোচ্ছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধের স্মৃতি এবং দীর্ঘস্থায়ী বাহ্যিক চাপ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তাদের এক টেকসই সহনশীলতার উত্তরাধিকার দিয়েছে, যদিও এর জন্য সাধারণ মানুষকে চরম মানবিক মূল্য চোকাতে হয়েছে।
অবশ্যই, এই টিকে থাকার পেছনের পুরো সংহতিই ধর্মীয় নয়। যেসব নাগরিক এই শাসনব্যবস্থার কঠোর সমালোচক, বিদেশি আগ্রাসনের মুখে তারাও হয়তো রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য হন। এটি আদর্শের প্রতি প্রেমের কারণে নয়, বরং জাতীয়তাবাদ, সম্মিলিত বিপদের আতঙ্ক বা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে।
ঠিক এখানেই ক্ষমতা তার চরম রূপটি ধারণ করে: বহিরাগত সহিংসতা সমাজের ভেতরের মতবিরোধের সীমারেখাকে মুছে দেয়। এটি নাগরিক অধিকার ও ভিন্নমতের পরিসরকে সীমিত করে দেয় এবং রাষ্ট্রকে সমালোচিত কর্তৃপক্ষের বদলে আবারও জাতীয় রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
শান্তিকালীন সময়ে অর্থনৈতিক পতন, দুর্নীতি বা জবরদস্তিমূলক শাসনের মতো যে ব্যর্থতাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যুদ্ধকালীন সময়ে বিদেশি হামলার মুখে রাষ্ট্র সেই দুর্বলতাগুলো ঢেকে ফেলে প্রতিরোধের এক লড়াকু অভিভাবক হিসেবে নিজের পুরোনো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
এর অর্থ এই নয় যে, এই রাজনৈতিক দর্শন সর্বজনীন বা অবিসংবাদিত। অনেক মানুষই দীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্রের এই পবিত্র বয়ানে বিশ্বাস করা ছেড়ে দিয়েছেন এবং নেতৃত্বকে বৈধতার সংকটে পড়তে হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি আদর্শিক বয়ান কার্যকর হওয়ার জন্য দেশের প্রতিটি মানুষের শর্তহীন বিশ্বাসের প্রয়োজন হয় না।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যদি মনে করে যে, বিপুল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলেই এই রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক ব্যবস্থার সমস্ত অর্থ বা বিশ্বাস শূন্য হয়ে যাবে, তবে তারা সম্ভবত সেই মনস্তত্ত্বকেই গভীরভাবে ভুল বুঝছে, যার বিরুদ্ধে তারা লড়ছে। মার্কিন নেতৃত্বের দিক থেকে আসা চরম অবমাননাকর বা ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ দাবিগুলো মূলত উত্তেজনাই বাড়ায় এবং রাষ্ট্রকে ঠিক সেই ধরনের এক ‘বহিরাগত শত্রু’র বয়ান প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে, যা তাদের নিজেদের অবস্থানকে সংহত করতে প্রয়োজন।
এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য কোনোভাবেই রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নকে যৌক্তিকতা দেওয়া বা আত্মত্যাগের ধারণাকে রোমান্টিকীকরণ করা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় স্বার্থসিদ্ধির জন্য ধর্মীয় বিশ্বাসকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে আদর্শের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
তবে, বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনার স্বার্থেই আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, এই রাষ্ট্রকাঠামোর সহনশীলতা কেবল সামরিক নয়, বরং গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রতীকী। আঘাতকে নৈতিক কর্তৃত্বে রূপান্তর করার সক্ষমতার মধ্যেই এর মূল ভিত্তি নিহিত।
এই সংঘাত এক ভিন্নতর বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে। একদিকে এটি রাষ্ট্রের বস্তুগত বা কাঠামোগত ভিত্তিগুলোকে দুর্বল করে দিতে পারে, কিন্তু অন্যদিকে এটি সেই ধর্মতাত্ত্বিক ও আদর্শিক বিশ্বাসকেই আরও মজবুত করে তুলতে পারে, যার ওপর ভর করে এই রাষ্ট্রটি দশকের পর দশক ধরে টিকে আছে।




