যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি ও নিউইয়র্ক এলাকায় অভিবাসন আইনজীবীর ছদ্মবেশে একটি চক্রের প্রতারণার ভয়ংকর তথ্য ফাঁস করেছেন সরকারি আইনজীবীরা। চক্রটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একটি ‘ছায়া আদালত’ পরিচালনা করে অসহায় অভিবাসীদের কাছ থেকে লক্ষাধিক ডলার আত্মসাৎ করেছে।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) নিউ জার্সির একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কলম্বিয়াগামী একটি বিমানে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে একই পরিবারের তিন ভাই-বোনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দেশ ছেড়ে পালানোর জন্য তাদের কাছে একমুখী টিকিট ছিল।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- ড্যানিয়েলা আলেজান্দ্রা সানচেজ রামিরেজ (২৫), জোহান সেবাস্টিয়ান সানচেজ রামিরেজ (২৯), আলেকজান্দ্রা প্যাট্রিসিয়া সানচেজ রামিরেজ (৩৮), চক্রের চতুর্থ সদস্য মার্লিন ইউলিটজা সালাজার পিনেদা (২৪)। নিউ জার্সির একটি রেস্তোরাঁ থেকে আটক করা হয়।
মামলার পঞ্চম আসামি বর্তমানে কলম্বিয়ায় পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ।
আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, ড্যানিয়েলা, জোহান এবং মার্লিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ অভিবাসন অনুমতিতে অবস্থান করছিলেন এবং আলেকজান্দ্রা দেশটিতে প্রবেশ করেছিলেন পর্যটক ভিসায়।
সরকারি আইনজীবীদের তথ্যমতে, চক্রটি একটি সম্পূর্ণ ভুয়া আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করত। অথচ তাদের কারোরই যুক্তরাষ্ট্রে আইন পেশায় কাজ করার কোনো সনদ বা আইনি বৈধতা ছিল না। তাদের প্রতারণার ধাপগুলো ছিল সিনেমার গল্পের মতো।
সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার:
তারা মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে স্প্যানিশভাষী ও আইনি সহায়তা প্রত্যাশী সহজ-সরল অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু বানাত।
ভুয়া আদালত ও ভিডিও শুনানি:
শিকার ফাঁদে পা দিলে তারা ভিডিও কলের মাধ্যমে ভুয়া বিচারিক শুনানির আয়োজন করত। এ সময় তারা অভিবাসন বিচারক, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তা এবং আইনজীবীর পোশাক পরে নিখুঁত অভিনয় করত।
সাজানো দৃশ্যপট:
বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য ভিডিও কলে মার্কিন সরকারি সিল, পতাকা এবং আদালতের কাঠগড়ার মতো দৃশ্যপট ব্যবহার করা হতো।
হুমকি ও ব্ল্যাকমেইল:
কেউ যদি তাদের প্রতারণা ধরে ফেলত, তখন চক্রটি তাকে অভিবাসন পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার এবং দেশ থেকে বিতাড়নের হুমকি দিয়ে উল্টো আরও টাকা দাবি করত।
তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আইনি সেবার নামে শত শত থেকে শুরু করে হাজার হাজার ডলার ফি নিত। এভাবে তারা অন্তত এক লাখ ডলারেরও (প্রায় এক কোটি বিশ লাখ টাকা) বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এর মধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ তারা কলম্বিয়ায় থাকা তাদের সহযোগীদের কাছে পাচার করেছে।
প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা বিশ্বাস করতেন যে, তাদের অভিবাসন সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। ফলে তারা আসল আদালতের নির্ধারিত শুনানিতে অনুপস্থিত থাকতেন। এর চরম মূল্য চোকাতে হয়েছে অনেককে; অন্তত একজন ভুক্তভোগীকে কেবল এই প্রতারণার শিকার হয়ে আসল শুনানিতে না যাওয়ার কারণে, বিচারক তার অনুপস্থিতিতেই দেশ থেকে বিতাড়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন (যা পরবর্তীতে বাতিল করা সম্ভব হয়)।
নিউ ইয়র্কের একজন শীর্ষ সরকারি আইনজীবী এই ঘটনাকে অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, ‘‘এই চক্রটি অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে বিচারক, আইনজীবী ও সরকারি কর্মকর্তাদের পরিচয় চুরি করে আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত হেনেছে। তারা অসহায় মানুষদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কেবল অর্থই চুরি করেনি, বরং তাদের জীবনকেও বিপন্ন করেছে।’’
গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে টেলিযোগাযোগ জালিয়াতির ষড়যন্ত্র, অর্থ পাচারের ষড়যন্ত্র এবং সরকারি কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় ধারণের মতো গুরুতর সব অভিযোগ আনা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ বিশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
সতর্কতা: মার্কিন অভিবাসন আদালত বা সরকারি সংস্থা কখনোই সামাজিক মাধ্যম বা ব্যক্তিগত বার্তার মাধ্যমে আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করে না। অভিবাসন আইনজীবীদের নিয়োগ দেওয়ার আগে সর্বদা তাদের সরকারি আইনজীবী সমিতি থেকে অনুমোদন বা সনদ যাচাই করা আবশ্যক।




