
🎧অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে আগামী তিন মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। অন্যদিকে, এলাকায় ছিনতাই ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান ও ব্লক রেইড জোরদার করেছে পুলিশ। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেও আবাসিক এলাকা সলিমুল্লাহ রোডে সামুরাই হাতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন বাসিন্দারা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজান জানিয়েছেন, অপরাধীরা পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে এক গলি এড়িয়ে অন্য গলিতে গিয়ে ছিনতাই করছে। এ কারণে বিশেষ অভিযান ও ব্লক রেইড জোরদার করা হয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তবে মোহাম্মদপুরের একের পর এক ছিনতাই, অস্ত্র প্রদর্শন ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রশ্ন তুলছে, কতটা নিরাপদ এই এলাকার সড়ক ও গলিগুলো।
গত ২১ অক্টোবর বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিট। মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের অনুপম গলিতে হাঁটছিলেন এক তরুণ ও এক তরুণী। এ সময় একটি অটোরিকশা থেকে নেমে দুই ছিনতাইকারী তাঁদের পথ আটকায়। বের করে বড় সামুরাই। কিছুক্ষণের মধ্যে দেশীয় অস্ত্র হাতে আরও দুজন তাদের সঙ্গে যোগ দেয়।
এরপর শুরু হয় ধস্তাধস্তি। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তরুণ-তরুণীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। ফোন দিতে বাধা দিলে তরুণীকে কোপানোর হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তিতে দুজনই রাস্তায় পড়ে যান।
ঘটনাটি দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করেন। তবে ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে অটোরিকশায় করে পালিয়ে যায় তারা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, চার থেকে পাঁচজনের হাতে বড় চাপাতি ছিল। দিনের ব্যস্ত সময়ে এমন ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সলিমুল্লাহ রোডে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ২১ অক্টোবরের ঘটনার ১৫ ঘণ্টা না পেরোতেই ২২ অক্টোবর ভোরে একই এলাকায় একই কায়দায় আরেকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এর আগে ১৩ অক্টোবর চার ছিনতাইকারী এক যুবককে সামুরাই ঠেকিয়ে জিম্মি করে তার আইফোন ছিনিয়ে নেয়। ফোন নেওয়ার পর সেটির লক খুলে দিতেও বাধ্য করে তারা। এক সপ্তাহে এলাকায় পাঁচটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ছিনতাইকারীরা অটোরিকশায় এসে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পথচারীদের জিম্মি করছে। দিনের বেলায় প্রকাশ্যে এমন ঘটনা ঘটলে রাতের পরিস্থিতি কী, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তাদের। পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ চান তারা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করতে নিজেরাই রাস্তায় নামছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মোহাম্মদপুরে দীর্ঘদিন ধরে বেড়িবাঁধ ও আশপাশের এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে এখন অপরাধের বিস্তার ঘটছে আবাসিক এলাকাতেও। সলিমুল্লাহ রোডের পাশাপাশি রায়েরবাজার ও বুদ্ধিজীবী সড়ক এলাকায় একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। এসব ঘটনায় একই চক্র জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এরই মধ্যে মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে সামুরাইসহ মো. মিঠু মিয়া (১৯) নামে এক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ২২ অক্টোবর দিবাগত রাতে ১ নম্বর বুদ্ধিজীবী রোডের মিনা হাউজ গলি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ বলছে, রায়েরবাজার ও বুদ্ধিজীবী সড়কে একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগসহ তার বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের দুটি মামলাও রয়েছে।
মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, ১২ অক্টোবর রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারের সামনে ছিনতাইয়ের সময় মিঠুর সঙ্গে পলাশ, লাল ও তোতা নামে তিন সহযোগী ছিলেন। তাঁরা চারজন মিলে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৯ হাজার টাকা, একটি বেসিক ফোন ও একটি স্মার্টফোন ছিনিয়ে নেন। ছিনিয়ে নেওয়া ফোন দুটি সানি নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়। মিঠুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হোসেন সাহেবের গলিতেও একই চক্র ছিনতাই করে। ওই ঘটনায় এক ব্যক্তির কাছ থেকে চার লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, এই চক্রের তিন সদস্য রবিউল আলম (২৭), রানা আহমেদ (২৫) ও হাফিজুর রহমান খান মোল্লাকে (২৫) আগেই গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, মাদক ও চুরিসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তার ও লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারে অভিযান চলছে।
এদিকে, মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ২২ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ফিউচার মডেল টাউনের ৫ নম্বর সড়কে আলমের গ্যারেজের পাশ থেকে ফিরোজ ওরফে কেন্তা ফিরোজকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, মারামারি ও মাদকসহ সাতটি মামলা রয়েছে।

একই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে বোটঘাট এলাকা থেকে ‘মুখে ল’ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য মো. দিদারকে (২৭) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতি ও মারামারিসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপি। পুলিশের দাবি, জাওরা রাব্বি ও ভান্ডারি ইমনের পরিচালিত এই গ্রুপের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানও জোরদার করা হয়েছে। গত ১৩ অক্টোবর রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবরসহ চার থানার আওতাধীন এলাকায় বিশেষ ব্লক রেইড চালিয়ে মোহাম্মদপুরে ৫৯ জন ও আদাবরে ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। অভিযানে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), সোয়াট, স্পেশাল রেসপন্স ব্রাঞ্চ (এসআরবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও ডগ স্কোয়াডের সদস্যরা অংশ নেন।
অভিযান শেষে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের কোনো অস্তিত্ব থাকতে দেওয়া হবে না। অপরাধ দমনে ভবিষ্যতেও এ ধরনের বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদর দপ্তরের উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, মোহাম্মদপুরে এসআরবির সদস্য ও অভিযানে নিয়োজিত কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিদিন ছোট-বড় অভিযান চলছে। সব বাহিনীর সহযোগিতায় শিগগিরই এলাকা থেকে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গত ২ অক্টোবর ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির এক অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে কিশোর গ্যাং উৎখাত করা সরকারের অঙ্গীকার। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবও কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর একটি কারণ। এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অন্যদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপরাধীরা এক এলাকায় পুলিশি তৎপরতা দেখলে অন্য এলাকায় গিয়ে অপরাধ করছে। এ কারণে শুধু নির্দিষ্ট স্থানে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। মোহাম্মদপুরে পুলিশ, এসআরবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চলছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, অভিযান ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ছিনতাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত টহল, সিসিটিভি নজরদারি এবং অস্ত্রধারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…

