মাস্তুল: প্রান্তিক বাস্তবতার অবমুক্তি এবং টাইম-ইমেজের নিরীক্ষা | চ্যানেল আই অনলাইন

মাস্তুল: প্রান্তিক বাস্তবতার অবমুক্তি এবং টাইম-ইমেজের নিরীক্ষা | চ্যানেল আই অনলাইন

মোহাম্মদ নূরুজ্জামানের নতুন ছবি মাস্তুল দেখতে যেয়ে বেশ নস্টালজিক হয়ে পড়া গেল। মনে পড়ে গেল চার-পাঁচ দশক আগের ছবি সূর্য দীঘল বাড়ী, দহন অথবা সুরুজ মিয়ার কথা। কিংবা, আশির দশকে যখন শুরু হলো বিকল্প ও স্বাধীন ধারার আন্দোলন; তখনকার আগামী, হুলিয়ার মতো ছবিগুলোর কথা। সেই যে, ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের তরুণেরা শুরু করেছিলেন নিও রিয়ালিজমের এক বাংলাদেশী ঘরানা; মাস্তুল যেন সেই স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রেরই আজকের সংস্করণ। কিন্তু একই সাথে মাস্তুল আরো কিছু হয়ে উঠতে চায়; অন্তত আঙ্গিকগতভাবে তো বটেই।

মাস্তুল দৃশ্যগতভাবে নিরাভরণ, কিন্তু অভিঘাতী। এই অভিঘাত যতটা নতুন বাস্তবতাকে দেখার ভেতর দিয়ে; তারও চেয়ে বেশি উপেক্ষিত এবং প্রান্তিক বাস্তবতার দিকে দৃষ্টিক্ষেপের ভেতর দিয়ে। সিগফ্রেড ক্রাউচার চলমান ছবির যে রিডেম্পশন অব রিয়ালিটির সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন মাস্তুল অন্তত সেই কাজটি শুরু করে।

একটি তেলবাহী নৌযান নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে নোঙ্গর ফেলে থাকে। তার ইঞ্জিনের মেরামত চলে সেখানে। চলচ্চিত্রের অতিক্রান্ত সময় আমাদের এই নৌযানের দিন-রাত্রির ভেতর দিয়ে নিয়ে চলে। সেখানে মাস্টার, সুকানি, লস্কর, ড্রাইভার, বাবুর্চি মকবুল, মিস্ত্রী এবং আর সব নাবিকদের দিন-যাপনের বাস্তবতা আমাদের অভিজ্ঞতার ভেতর জমতে থাকে। জাহাজ অথবা নৌযানটির ব্রিজ থেকে ইঞ্জিনরুম পর্যন্ত গোটা স্থাপত্যটি আমরা আত্মস্থ করি। কখনও আমরা বন্দরের মাটিতে পৌঁছে যাই। বাজার, রেল স্টেশন, সড়ক, গলি, রেড লাইট এলাকা এসব ধরে মকবুল, নুরা আর সুকানির সাথে যে চলা তা আমাদের মধ্যে রিডেম্পশন অব রিয়ালিটির কাজটি চালিয়ে যেতে থাকে। এসব প্রান্তিক বাস্তবতার অভিজ্ঞতা আমাদের কীভাবে ধনী করে?

আমরা নৌযানটিতে যে জীবন এবং বন্দরে যার এক ধরনের এক্সটেনশন সেখানকার মানবিক নানা সংকটকে বোধে আনি। মানুষের নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, ক্রূরতা এবং কম্‌প্যাশনকে পুনর্বিবেচনা করতে প্রস্তুত হই। নৌযানটি ক্রমশ একটি চরিত্র হয়ে উঠতে থাকে আমাদের অভিজ্ঞতার ভেতর। এই যে বাস্তবতাকে পুনরাবিষ্কারের অভিযান, এখানে টাইম-ইমেজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেননা, প্রত্যক্ষণ এবং তার জন্য বরাদ্দকৃত সময়ের প্রাচুর্য একটি ঘটনাবহুল গল্পের সম্ভাবনাকে বাতিল করে দেয়। বাহ্যে একটি গল্পের ধারা অবশ্য চলতেই থাকে। কিন্তু তার চেয়ে প্রধান হয়ে ওঠে সময় এবং প্রত্যক্ষণ। প্রাথমিক অস্বস্তি কাটিয়ে আমরা, দর্শক, এই চ্যালেঞ্জ মেনে নেই এবং প্রান্তিক বাস্তবতাবিষয়ক এই জার্নিতে শামিল হই।

মাস্তুলের চরিত্ররা ত্রিমাত্রিক হয়ে ওঠে না; বরং টাইম-ইমেজের যে প্রবাহই এই চলচ্চিত্রে প্রধান; তাকে দেয় এক ধরনের বাস্তব যৌক্তিকতা। অথবা সময়ের এই দ্বিমাত্রিক চিত্রায়ন যেন এক মিউজিক্যাল কম্পোজিশন; সেখানে হারমনির কাজ করে চরিত্ররা।

মকবুল যেমন নীরব; কেবল বাঁশিতেই যত কথা আর আবেগের ইঙ্গিতময় প্রকাশ; তেমনি মুখর সুকানি, তার সব লোভ, ক্রূরতা, মিথ্যাচার, ঔদ্ধত্য নিয়ে। মাস্টার যেন এক দার্শনিক যার বয়ে চলাতেই আনন্দ। লস্করের ফোনালাপে এই বাস্তবতার বাইরে যে পৃথিবী তার সাথে যোগ ঘটে আমাদের। আর নুরা সম্ভবত এই চলচ্চিত্রের হয়ে ওঠার কারণ; এই টাইম ইমেজের Raison d’être । এভাবেই মাস্তুলের সম্পন্নতা।

কিন্তু সাদা-কালোতে হাই কী-লো স্যাচুরেশন ইমেজ এই বাস্তবতা অন্বেষণকে আরো প্রাচুর্যময় এবং সংবেদী করতে পারত। তার তুলনায় এই চলচ্চিত্রের সাদা-কালো ইমেজ বেশ পাংশু, ফ্যাকাশে। আবার এও ভাবি যে, হয়তো নাটকীয় এক স্পেকটেক্যাল হয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়ানোর জন্যেই এই ব্যবস্থা। আর নৌযানটির একটি চরিত্র হয়ে ওঠার যে যাত্রা তাকে আরো প্রাণজ করে তোলা যেত কি না সে ভেবে দেখার বিষয় বটে। অন্তত নুরাকে এক অজানা ঘাটে নামিয়ে দেওয়ার পর নৌযানের ভেতর আরো কিছুটা সময় কাটাতে চাই যেন আমরা। গল্পের যে বাহ্যিক আদল তাকে মেনে সেটার বোধহয় কোনো উপায় রাখা যায় নি। কিন্তু, আমরা এই দাবি একটি দারুণ সাহসী টাইম-ইমেজের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে তুলতেই পারি।

Scroll to Top