মালয়েশিয়ায় খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বড় বাধা শুল্ক ও হালাল সনদ

মালয়েশিয়ার বিশাল হালাল খাদ্যের বাজারে বাংলাদেশি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রয়েছে ব্যাপক সম্ভবনা। তবে বিগত সময়ে রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান খুব বেশি পাকাপোক্ত হয়নি চড়া শুল্ক ও হালাল সনদায়নের জটিলতার কারণে। যেখানে এ বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো বিনাশুল্কে পণ্য রপ্তানি করছে, সেখানে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য গুণতে হচ্ছে চড়া শুল্ক।

হালাল-মুজ্জে

বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা বলছেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং হালাল সনদ সংক্রান্ত বাধা অপসারণ করা গেলে খাদ্যপণ্যের রপ্তানি একলাফে ৫ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।

তথ্য বলছে, মোটাদাগে এ দুই সমস্যায় মালয়েশিয়ার বাজারে দিন দিন প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় পণ্য পাঠাতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক দিতে হচ্ছে।

বিপরীতে প্রতিযোগী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থাকার কারণে দেশটি শূন্য থেকে মাত্র ৫ শতাংশ শুল্কে পণ্য রপ্তানির সুবিধা পাচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, সস্তা শ্রম ও কাঁচামালের সহজলভ্যতার কারণে খদ্যপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের খরচ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে তুলনামূলক কম। তবে এ উচ্চ শুল্কের কারণে প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্ক বা ডিউটি দিতে হয়। যেমন, জুস ও কনফেকশনারি জাতীয় পণ্যে ৩০ শতাংশের বেশি এবং নুডলসে প্রায় ১১ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়।- পিনাকল ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম ভূঁইয়া
ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র মালয়েশিয়ার বাজারে যদি শূন্য শুল্কে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়, তবে প্রতিযোগী অন্য দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাজার দখল করা সম্ভব হবে। কেবল দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রক্রিয়াজাত খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘প্রাণ’-এর রপ্তানিই অন্তত ৫ গুণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

এজন্য দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণে প্রয়োজন বাণিজ্য চুক্তি। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) কিংবা কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) সই হলে তা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

মালয়েশিয়ার বাজারে খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে এরই মধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান প্রাণ। এ বাজারে প্রাণ- এর রপ্তানি প্রায় ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরাসরি রপ্তানির পাশাপাশি পরিবেশক পিনাকল ফুডসের মাধ্যমে প্রাণ তাদের পণ্য মালয়েশিয়ায় বাজারজাত করছে।

রপ্তানি প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে পিনাকল ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম ভূঁইয়া জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্ক বা ডিউটি দিতে হয়। যেমন, জুস ও কনফেকশনারি জাতীয় পণ্যে ৩০ শতাংশের বেশি এবং নুডলসে প্রায় ১১ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়।

অপরদিকে, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) থাকায় ওইসব দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে শূন্য শতাংশ (০%) ডিউটি সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে অতিরিক্ত শুল্কের কারণে পণ্য ভালো মানের হওয়া সত্ত্বেও বিদেশি প্রতিযোগী ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে মূল্যের দিক থেকে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

গত জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি সফরকালে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। তবে বিষয়টি কেবল আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কার্যকর চুক্তি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন রপ্তানিকারকরা।

এ বিষয়ে সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় কথা বলেছেন বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী। তিনি জানান, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে ঢাকায় শুরু হতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার এক প্রতিনিধিদল ঢাকায় সফর করবে।

হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে এফটিএ সইয়ের জন্য ২০২৭ সালের ডিসেম্বরকে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী মাসের প্রথম দফার আলোচনা চুক্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।

শুধু প্রাণ নয়, বাংলাদেশের দুই থেকে তিন ডজন প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়ার বাজারে খাদ্যপণ্য রপ্তানি করছে। এসব কোম্পানির দাবি, বাণিজ্য চুক্তির পরে মালয়েশিয়ায় পণ্য রপ্তানির দ্বিতীয় প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে হালাল সনদায়ন।

মালয়েশিয়ার সুপারমার্কেটসহ যে কোনো আনুষ্ঠানিক বাজারে হালাল সনদ ছাড়া খাদ্যপণ্য বিপণন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

হালাল মার্কেটগুলোতে হালাল সনদ খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে হালাল সনদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং বিএসটিআই থেকে দিলেও তাদের সনদ আন্তর্জাতিক মানের নয়। যে কারণে অনেক দেশে পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যারমধ্যে একটি মালয়েশিয়া।- প্যারাগন এগ্রো লিমিটেডের হেড অব এক্সপার্ট আবুল কালাম আজাদ
জানা গেছে, প্রাণ-এর প্রায় ৮০০ ধরনের পণ্য রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও পর্যাপ্ত হালাল সনদের অভাবে মাত্র ১৫০টি পণ্য বাজারজাত করতে পারছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও তারা সনদায়ন জটিলতায় বেশি পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না।

মালয়েশিয়ায় কথা হয় মিহাস ফেয়ারে অংশ নেওয়া প্যারাগন এগ্রো লিমিটেডের হেড অব এক্সপার্ট আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, হালাল মার্কেটগুলোতে হালাল সনদ খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে হালাল সনদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং বিএসটিআই থেকে দিলেও তাদের সনদ আন্তর্জাতিক মানের নয়। যে কারণে অনেক দেশে পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যারমধ্যে একটি মালয়েশিয়া।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে হালাল পণ্য উৎপাদনের দারুণ অনুকূল পরিবেশ থাকলেও বিএসটিআই বা ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রদত্ত সনদ আন্তর্জাতিক অনেক ক্রেতা দেশ সরাসরি গ্রহণ করতে চায় না। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে পৃথকভাবে সনদের আবেদন করতে গিয়ে সময়, খরচ এবং জটিলতা বেড়ে যায় বহুগুণ।

এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ‘জাতীয় হালাল বোর্ড’ গঠন করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথ সমঝোতার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিএসটিআই ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মালয়েশিয়ান হালাল বোর্ডের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া, বাণিজ্যিক কূটনীতি জোরদারে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ী ও দুই সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা, সম্ভাবনাময় খাতগুলো চিহ্নিত করে দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং নিয়মিত ট্রেড শো-তে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত হালাল পণ্যের বাণিজ্য নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে মনে করেন বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা।

Scroll to Top