ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রধান উপকরণ হলো আইন ও বিচারব্যবস্থা। কিন্তু যখন সেই ব্যবস্থাই অসাধু চক্রের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ হয় না, বরং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ভিত্তিকেও দুর্বল করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনার অনুসন্ধানে ভুয়া মামলা, হয়রানিমূলক আসামি করা এবং মামলাকেন্দ্রিক বাণিজ্যের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা দেশের বিচারব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় হতাহতের ১০০টি মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিভিন্ন ঘটনার মামলায় প্রকৃত অপরাধীদের পাশাপাশি অনেক নিরীহ মানুষকে ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, সম্পদ দখলের চেষ্টা, প্রতিহিংসা কিংবা সরাসরি চাঁদাবাজির উদ্দেশ্য কাজ করেছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, কখনো কখনো একই ঘটনায় একাধিক মামলা করা হয়েছে, যেখানে শত শত মানুষকে নামসহ বা অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এমনকি মৃত ব্যক্তিদেরও আসামির তালিকায় যুক্ত করার ঘটনাও সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, অনেক মামলার বাদী পরে আদালতে হলফনামা দিয়ে বলেছেন যে ভুলবশত বা অন্যের পরামর্শে অচেনা মানুষদের আসামি করা হয়েছে। আবার বহু ক্ষেত্রে মামলার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন করতে হয়েছে। এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠে এসেছে। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ বলেছেন, মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে তাঁদের টাকা দিতে হয়েছে; অর্থাৎ মামলা শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়, একধরনের বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। একজন নিরপরাধ ব্যক্তি যখন মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়েন, তখন তাঁর সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক অবস্থা ও পারিবারিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রেপ্তার, জামিন, আদালতে হাজিরা—সব মিলিয়ে একটি মামলা বছরের পর বছর একজন মানুষকে অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের মধ্যে রাখে। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি, ব্যবসা বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব মামলার সঙ্গে একটি চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু রাজনৈতিক কর্মী, অসাধু আইনজীবী, পুলিশ সদস্য ও দালাল চক্র মিলে মামলাকে কেন্দ্র করে একটি অনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। কোথাও মামলা দেওয়া, কোথাও গ্রেপ্তার দেখানো, আবার কোথাও নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। যদি এ অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং আইনের শাসনের জন্য একটি গুরুতর হুমকি।
সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা না পাওয়া গেলে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দিয়ে নির্দোষ ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার না করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগগুলো ইতিবাচক। তবে বাস্তবতা হলো, এখনো বহু মানুষ হয়রানির অভিযোগ করছেন। এর অর্থ হলো, সরকারের ঘোষিত বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, মামলা দায়েরের সময় প্রাথমিক যাচাই–বাছাই আরও কঠোর করতে হবে। অযৌক্তিকভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আসামি করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তদন্তপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও নিরপেক্ষ করতে হবে, যাতে নির্দোষ ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন মামলার বোঝা বহন করতে বাধ্য না হন। তৃতীয়ত, মামলা–বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ন্যায়বিচারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নিরপরাধ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। যদি এই মৌলিক নীতি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে পুরো বিচারব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই ভুয়া মামলা ও মামলা–বাণিজ্যের প্রবণতা বন্ধ করতে এখনই দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।


