ময়মনসিংহে সার ডিলার নিয়োগে আর্থিক লেনদেন ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, তালিকায় এমপির স্বজন

ময়মনসিংহে নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, শুরু হয়েছে বিতর্ক। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সংসদ সদস্যের ভাই ও মামা, খুচরা সার বিক্রেতা, ধান-চালের ব্যবসায়ী এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের ডিলার। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেন এবং যোগ্য আবেদনকারীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ তুলেছেন একাধিক আবেদনকারী ও রাজনৈতিক নেতা। এ নিয়ে বিভিন্ন উপজেলায় মানববন্ধন, প্রতিবাদ কর্মসূচি ও সংবাদ সম্মেলন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা। এমনকি সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্যও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন।

ময়মনসিংহে সার ডিলার নিয়োগে

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহের ১৪টি উপজেলার ১৪৫টি ইউনিয়নে ১৫৬ জন সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে আবেদন জমা পড়ে ১ হাজার ৭৪৪টি। যাচাই-বাছাই শেষে গত ৯ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে জেলার ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকার নতুন ডিলারদের তালিকা প্রকাশ করা হয়।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ এবং সারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে তালিকাটি চূড়ান্ত করা হয়। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রথমে অস্থায়ীভাবে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। তিন মাস পর্যবেক্ষণের পর তাদের কার্যক্রম সন্তোষজনক হলে ডিলারশিপ স্থায়ী করার কথা রয়েছে। তবে তালিকা প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন উপজেলায় নিয়োগের স্বচ্ছতা, যোগ্যতা যাচাই এবং সুপারিশের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এমপির ভাই ও মামার ডিলারশিপ নিয়ে প্রশ্ন

ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানের পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, গফরগাঁওয়ের লংগাইর ইউনিয়নে মেসার্স এসএম এন্টারপ্রাইজের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন মো. মনিরুজ্জামান। তিনি সংসদ সদস্যের আপন ছোট ভাই এবং দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক।

উস্থি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন সংসদ সদস্যের মামা মো. মনিরুজ্জামান জসিম। তার প্রতিষ্ঠানের নাম জাহিদুল স্যানিটারি অ্যান্ড হার্ডওয়্যার। এ ছাড়া যশরা ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছে সেলিম ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল রানা গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। স্থানীয়ভাবে তিনি সংসদ সদস্যের চাচাতো শ্যালক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক ত্যাগ, ব্যবসায়িক যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং গোডাউন করার সক্ষমতা যাচাই করেই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, ভাই ও মামা নিজেদের যোগ্যতায় ডিলারশিপ পেয়েছেন। তবে তার কোনো চাচাতো শ্যালক নেই বলে জানানো হয়েছে।

সংসদ সদস্য বলেন, আমার ভাই তো হোমলেস ছিল, বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। তার বাড়িঘর বাবেল (আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ফাহমি গোলন্দাজ) ভেঙে দিয়েছিল, আমার মা অনস্পট স্ট্রোক করেছিল। আজ আমি এমপি বাট আই অলসো হোমলেস।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে নির্যাতিত ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তারা সুবিধাবাদী।

খুচরা সার বিক্রেতা থেকে নতুন ডিলার

হালুয়াঘাট উপজেলার শাকুয়াই বাজারে মেসার্স সালমান ইসলামীয়া স্টোরকে নতুন সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হোসাইন আহম্মদ সালমান আগে খুচরা সার ডিলার ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন অবৈধভাবে সার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।

হোসাইন আহম্মদ সালমান বলেন, তার বাবার মৃত্যুর পর ২০০৮ সাল থেকে তিনি ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। তিন-চার বছর আগে খুচরা ডিলারশিপ নিয়ে সার বিক্রি শুরু করেন। নতুন ডিলার নিয়োগের জন্য আবেদন করার পর কর্তৃপক্ষ তাকে যোগ্য মনে করায় নিয়োগ পেয়েছেন। নতুন ডিলারশিপ পাওয়ার আগে খুচরা ডিলারশিপ প্রত্যাহার করে টাকা তুলে নিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে হালুয়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ওই খুচরা ডিলারের ডিলারশিপ বাতিল হয়নি। প্রত্যাহারের কোনো আবেদনও তার কাছে জমা পড়েনি। খুচরা ডিলার থাকা অবস্থায় কীভাবে তিনি নতুন করে ডিলারশিপ পেয়েছেন, তা জেলা কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।

শাকুয়াই ইউনিয়নে ডিলারশিপের আবেদন করেছিলেন ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য আবুল খায়ের। তিনি বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েও তিনি নিয়োগ পাননি। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি খুচরা ডিলার হয়ে থাকলে তার ডিলারশিপ বাতিল করা উচিত। আর নিয়ম অনুযায়ী যোগ্য হলে নিয়োগ বহাল রাখা যেতে পারে। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সমাধান চান তিনি।

সার বিক্রির অভিজ্ঞতা না থাকার অভিযোগ

ফুলপুর উপজেলার ভাইটকান্দি ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মেসার্স সাদিকা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের ডিলার এবং ধান-চালের ব্যবসায়ী। তবে তার সার বিক্রির অভিজ্ঞতা নেই বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।

গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) ফুলপুর বাসস্ট্যান্ডে ‘ভাইটকান্দি ইউনিয়নের সর্বস্তরের কৃষক ও জনগণ’ এর ব্যানারে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। সেখানে স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীরা সাখাওয়াতকে আওয়ামী লীগের সমর্থক আখ্যা দিয়ে তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান।

ভাইটকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুর রহমান বলেন, প্রকৃত সার ব্যবসায়ী না হয়েও কীভাবে সাখাওয়াতকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলো, তা প্রশাসনের কাছে জানতে চাই। এ সময় নতুন করে যাচাই-বাছাই করে ডিলার নিয়োগের দাবিও জানান তিনি।

তবে সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তার ছবি তৈরি করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, নীতিমালা অনুসরণ করেই ডিলারশিপ পেয়েছেন এবং এ জন্য কোনো আর্থিক লেনদেন করতে হয়নি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে সংবাদ সম্মেলন করলেও তিনি আইনি পদক্ষেপ নেননি।

১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ

সার ডিলার নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন গৌরীপুরের এক আবেদনকারী। গত ১২ অক্টোবর গৌরীপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মেসার্স মুন্সী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও পৌর কৃষক দলের সভাপতি মো. গোলাম কাজীয়েল হাজাত শাহী মুন্সী অভিযোগ করেন, প্রতিটি ডিলার নিয়োগে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার অলিখিত বাণিজ্য হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, লটারিতে প্রথম স্থান অর্জন করেও ডিলারশিপ পাননি। এমনকি লটারিতে বিজয়ীদের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, ফুলপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগের তালিকা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বঞ্চিত আবেদনকারী ও বিএনপি নেতারা। তাদের অভিযোগ, যোগ্য আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সংসদ সদস্যেরও

নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ। নিজের ফেসবুক পোস্টে প্রশাসনের একাংশের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি লেখেন, ‘কে কোথা থেকে কত পার্সেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি।’

রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা মামলা-হামলার শিকার হবেন, আর অর্থের বিনিময়ে সার ডিলারশিপ দেওয়া হবে, এমনটা হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন। গত ৯ অক্টোবর নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়াসহ বিভিন্ন উপজেলার কিছু ইউনিয়নে ফ্যাসিবাদের দোসরদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল পর্যায়ে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন বলে দাবি করেন, স্থানীয় প্রশাসন যাদের নাম তালিকার প্রথম ক্রমিকে পাঠিয়েছে, মন্ত্রণালয় তাদেরই নিয়োগ দিয়েছে। যোগ্য আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের কীভাবে তালিকার প্রথমে রাখা হলো, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

কী বলছে জেলা প্রশাসন

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, জেলায় ১৫৬ জন ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ১ হাজার ৭৪৪টি আবেদন জমা পড়েছে। গড়ে প্রতিটি ইউনিয়নে ১২ থেকে ১৩ জন আবেদন করেছেন। কিন্তু সুপারিশ করার সুযোগ ছিল একজনের জন্য। এ কারণে অন্য আবেদনকারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। নীতিমালার বাইরে কাউকে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হয়েছে, এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিদ্যমান খুচরা সার ব্যবসায়ীরা নতুন ডিলার হতে পারবেন না, নীতিমালায় এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

সংসদ সদস্যের স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়ে সাইফুর রহমান বলেন, কে কার আত্মীয়, সেটি বিবেচ্য নয়। নীতিমালায় নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, তারা এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে অবগত নয়। কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে তা তদন্ত করে দেখা হবে।

Scroll to Top