
ঢাকা, ৫ জুলাই – হাতে বোর্ডিং পাস, সম্পন্ন হয়েছিল চেক-ইন ও ইমিগ্রেশনের মতো কঠোর সব প্রক্রিয়াও। মালয়েশিয়াগামী বিমানের সিটে বসার ঠিক আগের মুহূর্তে ঘটল এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড। পাঁচজন যাত্রীর ভিসার সঙ্গে পাসপোর্টের গরমিল ধরা পড়তেই যেন ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ’ বেরিয়ে এল। সেই খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্রই বিমানে ওঠার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি ৭১ জন যাত্রী একে একে বিমানবন্দর থেকে উধাও হয়ে গেলেন! শেষ পর্যন্ত ৭৬ জন যাত্রীকে রেখেই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি।
শনিবার (৪ জুলাই) রাতে ঢাকা-মালয়েশিয়া রুটের বিজি-৩৮৬ ফ্লাইটে এই নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে। রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজটি ২৪৫ জন যাত্রী নিয়ে ওড়ার কথা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত বড় অঙ্কের যাত্রী ফেলে রেখেই রওনা হতে হয় বিমানটিকে।
বোর্ডিং গেটের সেই নাটকীয় মুহূর্ত: যেভাবে পালালেন ৭১ যাত্রী
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, মালয়েশিয়াগামী এই ফ্লাইটের ৭৬ জন যাত্রী একসঙ্গে চেক-ইন কাউন্টার থেকে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করেন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে বোর্ডিং গেটে বিমান ছাড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ইমিগ্রেশন পুলিশের বিশেষ চেকিংয়ে ৫ জন যাত্রীর ই-ভিসার সঙ্গে পাসপোর্টের তথ্যে মারাত্মক গরমিল ধরা পড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে ওই ৫ জনকে অফলোড (বিমানযাত্রা বাতিল) করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান “বোর্ডিং চলাকালে হঠাৎ করেই কয়েকজন যাত্রীকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। তখনই জানা যায় তাদের ভিসা জাল। এই খবরটি লাইনে থাকা বাকি যাত্রীদের মধ্যে ছড়াতেই এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়। পেছনের লাইনে থাকা আরও বহু যাত্রীকে আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি। তারা কাউকেই কিছু না বলে বিমানবন্দর থেকে চম্পট দেন।”
গাফিলতি নাকি চক্রের হাত? উঠছে বড় প্রশ্ন
এই ঘটনার পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দায়িত্বজ্ঞান নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী, একজন যাত্রীর ভিসা আসল নাকি নকল, তা যাচাই করার জন্য বিমানবন্দরে একাধিক কঠোর ধাপ রয়েছে।
১ম ধাপ (চেক-ইন কাউন্টার): বিমান সংস্থার দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভেরিফায়েড করে বোর্ডিং পাস দেওয়া। কিন্তু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাউন্টার থেকে ভিসা যাচাই ছাড়াই তাদের বোর্ডিং পাস দেওয়া হয়।
২য় ধাপ (ইমিগ্রেশন পুলিশ): ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে জাল ই-ভিসা শনাক্ত করার সব আধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ৭৬ জন যাত্রী ইমিগ্রেশন পার হয়ে গেলেন, তা নিয়ে খোদ বিমানবন্দর সূত্রই বিস্ময় প্রকাশ করেছে।
চূড়ান্ত ধাপ অর্থাৎ বোর্ডিং গেটে গিয়ে যদি এই জালিয়াতি ধরা না পড়ত, তবে এই বিপুল সংখ্যক জাল ভিসাধারী যাত্রী অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে যেতেন।
ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে মানব পাচারের ছক?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিমানে না চড়া এবং পালিয়ে যাওয়া এই ৭৬ জন যাত্রীর সবাই ‘ট্যুরিস্ট’ বা পর্যটন ভিসায় মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। তবে বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, কোনো একটি বড় ট্রাভেল এজেন্সির মোটা অঙ্কের চুক্তির মাধ্যমে তাদের মালয়েশিয়ায় নিয়ে গিয়ে সেখানে অবৈধভাবে রেখে দেওয়ার একটি বড় পরিকল্পনা ছিল।
অবশ্য বিমানবন্দরের অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, অফলোড হওয়া এবং পালিয়ে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন মালয়েশিয়া হয়ে ওমরাহ হজ করার উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাচ্ছিলেন বলেও দাবি করেছিলেন। তবে তাদের যাত্রার উদ্দেশ্য এবং নথিপত্র সন্দেহজনক হওয়ায় এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এই বিশাল জালিয়াত চক্রের পেছনে বিমানবন্দরের ভেতরের কেউ জড়িত কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
এনএন/ ৫ জুলাই ২০২৬






