বেইজিংয়ের রাজপথে গত রবিবার যা ঘটল, তা দেখে রক্ত-মাংসের অ্যাথলেটদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াটাই স্বাভাবিক। বেইজিং হাফ-ম্যারাথনে ইতিহাস গড়েছে এক রোবট; মানুষের গতির দম্ভ চুরমার করে দিয়ে বিশ্বরেকর্ড নিজের নামে করে নিয়েছে এক যান্ত্রিক মানব। চীনা প্রযুক্তির এই জয়জয়কার এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার তুঙ্গে।

দক্ষিণ বেইজিংয়ের ইজুয়াং এলাকায় গত রবিবার ম্যারাথনের দৃশ্যটা ছিল দেখার মতো। একদিকে ঘাম ঝরানো অ্যাথলেট, অন্যদিকে যান্ত্রিক ক্ষিপ্রতা। দুর্ঘটনা এড়াতে দুই দলের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা হলেও লড়াইটা ছিল মূলত শ্রেষ্ঠত্বের। দর্শকদের ভিড় ঠেলে কিছু রোবট যখন উসাইন বোল্টের ভঙ্গিতে তীব্র গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন উপস্থিত সবার চোখ ছানাবড়া।
চীনা স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অনার’-এর হয়ে অংশ নেওয়া একটি হিউম্যানয়েড রোবট সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন সিস্টেমে সজ্জিত এই যন্ত্রটি ২১ কিলোমিটার (১৩ মাইল) পথ পাড়ি দিতে সময় নিয়েছে মাত্র ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ড। গড় গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৫ কিলোমিটার।
উগান্ডার অ্যাথলেট জ্যাকব কিপলিমোর দখলে থাকা মানুষের বর্তমান বিশ্বরেকর্ড হচ্ছে ৫৭ মিনিট ২০ সেকেন্ড। অর্থাৎ, যান্ত্রিক এই দৌড়বিদ মানুষের সেরা রেকর্ডকেও প্রায় ৭ মিনিট ব্যবধানে পেছনে ফেলে দিয়েছে। অথচ, গত বছরও এই দৌড়ে রোবটগুলো বারবার আছাড় খাচ্ছিল এবং সেরা রোবটটির সময় লেগেছিল ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিটেরও বেশি। এক বছরের মাথায় এই উন্নতি রীতিমতো বিস্ময়কর!
ম্যারাথন দেখতে আসা ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী হান চেনইউ রোবটের গতির ঝটকায় ছবি তুলতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন। প্রযুক্তির এই লাফ দেখে তিনি রোমাঞ্চিত হলেও তার কণ্ঠে ছিল শঙ্কার সুর। তিনি বলেন, প্রযুক্তি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে মানুষের চাকরি নিয়ে মাঝে মাঝে দুশ্চিন্তা হয়।
অন্যদিকে, ৪১ বছর বয়সী শি লেই মনে করেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ঘরের কাজ, বয়স্কদের সেবা এমনকি অগ্নিনির্বাপণের মতো বিপজ্জনক কাজেও এই রোবটরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠবে। তিনি কিছুটা বিষণ্ণ মনে যোগ করেন, হাজার বছর ধরে মানুষ পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ ছিল, কিন্তু এখন যান্ত্রিক নেভিগেশনে তারা আমাদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এই ম্যারাথন কেবল খেলার মাঠ নয়, বরং চীনের উদ্ভাবনী শক্তির এক প্রদর্শনী। সরকারি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালেই চীন রোবোটিক্স এবং ‘এমবডিড এআই’ খাতে প্রায় ১০.৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। গত বছর যেখানে মাত্র ২০টি রোবট অংশ নিয়েছিল, এ বছর সেই সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১০০।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কি তবে শেষের পথে? বেইজিংয়ের এই হাফ-ম্যারাথন অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। যেখানে মানুষের সীমাবদ্ধতা শেষ, সেখান থেকেই হয়তো শুরু হচ্ছে রোবটের জয়যাত্রা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা



