
ছবি: সংগৃহীত
🎧অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন
গত কয়েক মাসে এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায়। ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে খরা, বন্যা ও তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, শক্তিশালী এল নিনো আরও তীব্র হতে পারে এবং এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, এল নিনো বলতে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উষ্ণতা বৃদ্ধি, অর্থাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় সাগরের পানির বেশি তাপমাত্রাকে বোঝায়।
সাধারণত নিরক্ষরেখা বরাবর নিম্নস্তরের ভূপৃষ্ঠসংলগ্ন বাতাস পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয় (যাকে ‘ইস্টারলি উইন্ডস’ বলা হয়)। কিন্তু এল নিনোর সময় এসব বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে।
অথবা কিছু ক্ষেত্রে বিপরীত দিকে, অর্থাৎ পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে (‘ওয়েস্টারলি উইন্ডস’) প্রবাহিত হতে শুরু করে।
এটি বিশ্বজুড়ে স্বাভাবিক আবহাওয়ার ধরণে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
এল নিনো অনিয়মিত বিরতিতে ফিরে আসে। এর ব্যবধান দুই বছর থেকে এক দশক পর্যন্ত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনোর একটি ধারা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে, যা বিশ্বের বহু অঞ্চলে চরম আবহাওয়া বয়ে আনতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) বলেছে, ২০২৬ সালের বাকি সময়জুড়ে এল নিনোর পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিভিন্ন পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, এবারের এল নিনো রেকর্ড করা ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। এর সঙ্গে কয়েক দশকের মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যুক্ত হওয়ায় ২০২৭ সাল বিশ্বের উষ্ণতম বছরগুলোর একটি, এমনকি রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছরও হতে পারে। এর প্রভাবে আবহাওয়া, খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাব ইতোমধ্যে যেভাবে দেখা যাচ্ছে, তার পাঁচটি দিক তুলে ধরা হলো।
ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়ায়, যেখানে এল নিনোর বছরগুলো আবহাওয়া সাধারণত বেশি শুষ্ক ও উষ্ণ থাকে, সেখানে ২০১৫ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের মৌসুম চলছে।
এ বছর জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত আট লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। এটি গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা, যখন এল নিনোর কোনো প্রভাব ছিল না।
এই দাবানলের কারণে ইন্দোনেশিয়াজুড়ে স্কুল বন্ধ করতে হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে।
আগুন থেকে তৈরি বিষাক্ত ধোঁয়াশার সংস্পর্শে এসেছে সুমাত্রা ও কালিমানতানের লাখো মানুষ এবং প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার মানুষ শ্বাসতন্ত্রজনিত অসুস্থতায় ভুগেছে।
৪০ হাজারের বেশি ক্ষেত্রে আক্রান্ত হয়েছে শিশু, যাদের অসুস্থতার মধ্যে কাশি থেকে শুরু করে ব্রংকাইটিস এবং নিউমোনিয়ার মতো আরও গুরুতর অবস্থাও রয়েছে।
পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে হারিকেনের তৎপরতা বেড়েছে
পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে, যেখানে এল নিনো সাধারণত হারিকেনের তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়, সেখানে এ পর্যন্ত মৌসুমটি অত্যন্ত সক্রিয় ছিল।
এখানে ২২টি নামকরণ করা ঝড় এবং ১২টি হারিকেন আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে ১০টি ছিল বড় ধরনের হারিকেন।
মৌসুম শেষ হতে এখনও দুই মাস বাকি থাকলেও, এটি ইতোমধ্যেই একটি গড় মৌসুমে পুরো সময়জুড়ে যে সংখ্যক ঝড় গড়ে তৈরি হয়, তার চেয়ে বেশি।
এখানে এল নিনো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতর তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলের উঁচু স্তরে দুর্বল বাতাসের মতো অনুকূল উপাদান তৈরি করে, যা ঝড়কে সহজে শক্তি সঞ্চয় করতে সহায়তা করে।
হারিকেন পোলো এর এমনই একটি উদাহরণ।
অত্যন্ত উষ্ণ সাগরের পানির জোগান পাওয়া এই হারিকেন দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি করে এবং ঘণ্টায় ১৮০ মাইল (২৮৫ কিলোমিটার) বেগের দমকা হাওয়া তৈরি করে, যার পেছনে ছিল এল নিনো-সৃষ্ট উষ্ণ জলরাশি।
একই সময়ে একই অববাহিকায় আছড়ে পড়া তিনটি সক্রিয় হারিকেনের মধ্যে ছিল ওডালিস, নোলো ও পোলো।
এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে, অস্বাভাবিক সমুদ্র তাপ থেকে উৎপন্ন শক্তির কারণে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে একই সময়ে তিনটি হারিকেন সৃষ্টি হয়েছিল– লওয়েল, কারিনা ও মেরি।
এই বছরের আগে সর্বশেষ ২০১৫ সালে একই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরে তিনটি হারিকেন ছিল।
আটলান্টিকে অস্বাভাবিকভাবে শান্ত হারিকেন মৌসুম
প্রশান্ত মহাসাগরের বিপরীতে, আটলান্টিক মহাসাগর অস্বাভাবিকভাবে শান্ত রয়েছে। এল নিনো উত্তর আটলান্টিকে বায়ুপ্রবাহের উল্লম্ব পার্থক্য বা উইন্ড শিয়ার বৃদ্ধি করে, যা ঝড়কে ভেঙে দেয় এবং নতুন ঝড়ের সৃষ্টি সীমিত করে।
এ পর্যন্ত মাত্র একটি হারিকেন হয়েছে, ইসাইয়াস, যা ফ্লোরিডা প্যানহ্যান্ডেল এবং আলাবামায় আঘাত হেনেছিল।
স্যাটেলাইট যুগে (১৯৬০-এর দশক থেকে) এটি ছিল সবচেয়ে দেরিতে গঠিত হারিকেন।
এর আগে এই রেকর্ড ছিল ১১ই সেপ্টেম্বর, যা ২০০২ এবং ২০১৩ সালে তৈরি হয়েছিল।
একটি গড় মৌসুমে এ সময়ের মধ্যে ১০টি নামকরণ করা ঝড়, পাঁচটি হারিকেন এবং দুটি বড় ধরনের হারিকেন হওয়ার কথা।
কিন্তু এ বছর এখন পর্যন্ত মাত্র আটটি ক্রান্তীয় ঝড় হয়েছে– আর্থার, বার্থা, ক্রিস্টোবাল, ডলি, এদুয়ার, ফে, গনজালো এবং হান্না।
বৃষ্টি কমে গেছে ভারতে
ভারতেও শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়ার এই প্রবণতা দেখা গেছে, যেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি বৃষ্টিপাত গড়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম হয়েছে।
ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) এটিকে এখনো ‘স্বাভাবিক’ সীমার মধ্যে বলে বিবেচনা করলেও, পুরো দেশে বিভিন্ন অঞ্চলের সামগ্রিক গড় বৃষ্টিপাতের বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করে না।
মধ্য ভারতে প্রায় স্বাভাবিক পরিমাণ বৃষ্টি হলেও, পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গড়ের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে এবং সেগুলোকে ‘ব্যতিক্রমী’ খরাগ্রস্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বৃষ্টিপাত গড়ের তুলনায় ২৪ শতাংশ কম ছিল।
যেসব এলাকায় বৃষ্টিপাত গড়ের কাছাকাছি ছিল, সেখানেও মৌসুমি বৃষ্টির স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি; বরং দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের পর অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটেছে।
এর ফলে কৃষি উৎপাদনের ওপর চাপ ও ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
ভারতের মৌসুমি বৃষ্টিপাত বিভিন্ন আবহাওয়াজনিত প্রভাবের অধীনে থাকে। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এল নিনোই হয়তো একমাত্র কারণ ছিল না।
চীন ও জাপানের দিকে ধেয়ে আসছে শক্তিশালী টাইফুন
প্রশান্ত মহাসাগরের আরও পশ্চিমে, পূর্ব চীন ও জাপানেও মৌসুমটি সক্রিয় ছিল। মায়সাক ও দুজুয়ানসহ বিভিন্ন ঝড় সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক বন্যা ও ভূমিধস ঘটিয়েছে।
জাপান আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ১০টি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে, যা ১৯৬৬ সালের পর কোনো মৌসুমে সর্বোচ্চ সংখ্যা।
এল নিনোর সময় উষ্ণতর প্রশান্ত মহাসাগর বায়ুর ধরনে পরিবর্তন আনে, ফলে ঘূর্ণিঝড়গুলো সাধারণত জাপান ও পূর্ব চীন থেকে আরও পূর্বদিকে সৃষ্টি হয়।
তবে এর অর্থ হলো, ঝড়গুলো স্থলভাগে আঘাত হানার আগে উষ্ণ সাগরের পানি থেকে শক্তি সঞ্চয়ের জন্য আরও বেশি দূরত্ব ও সময় পায়, যার ফলে সেগুলো আরও শক্তিশালী টাইফুনে পরিণত হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এ বছর আরও কয়েকটি টাইফুন সৃষ্টি হতে পারে, যা জাপান বা পূর্ব চীনে অতিরিক্ত প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…

