মেক্সিকোর গুয়াদালাহারার এস্তাদিও গুয়াদালাহারায় বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচেই দেখা গেল প্রথম বড় চমক। চেক প্রজাতন্ত্রের (চেকিয়া) বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ২-১ গোলে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিতল সাউথ কোরিয়া। গোল করলেন হোয়াং ইন-বম ও বদলি নামা ও হিয়ন-গিউ, আর মাঝমাঠে ছড়ি ঘোরালেন লি কাং-ইন, যিনি ৩৭টি পাসের প্রতিটিই সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
দ্য অ্যানালিস্টের পরিসংখ্যানের পাতায় আরেকটি চমক, ১৯৮৬ সালের চোই সুন-হো এবং ১৯৯৪ সালের হং মিয়ং-বোর পর হোয়াং ইন-বম তৃতীয় কোরিয়ান হিসেবে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট দুটোই করলেন। সেই হং মিয়ং-বো এখন এই সাউথ কোরিয়া দলেরই কোচ।

হিসাবটা আরও মজার। ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপে জয়। ২০১৮-তে জার্মানিকে ২-০, ২০২২-এ পর্তুগালকে ২-১, এবার চেকিয়াকে ২-১। এশিয়ার ফুটবল যে আর শুধু অংশগ্রহণের গল্প নয়, বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহেই সাউথ কোরিয়া যেন সেই বার্তাটা আবারও মনে করিয়ে দিল।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এশীয় বহর
৪৮ দলের বিশ্বকাপে এবার এশিয়া থেকে খেলছে ৯টি দেশ: অস্ট্রেলিয়া, ইরাক, ইরান, জাপান, জর্ডান, সাউথ কোরিয়া, কাতার, সৌদি আরব এবং উজবেকিস্তান। জর্ডান ও উজবেকিস্তানের জন্য এটি ইতিহাস। দুই দলই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে। আর আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে বলিভিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরেছে ইরাক। ফ্রান্স, নরওয়ে ও সেনেগালের গ্রুপে পড়েছে তারা।
কার সম্ভাবনা কতটা, তারকা কারা
জাপান: এশিয়ার সবচেয়ে গোছানো দল। কুবো, মিতোমা, এন্দোদের প্রায় পুরো একাদশই ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলে। শেষ ষোলোর গণ্ডি পেরোনোই তাদের এবারের ঘোষিত লক্ষ্য।
সাউথ কোরিয়া: সন হিউং-মিন এখনো দলের প্রাণ, তবে এবারের চমক লি কাং-ইন আর হোয়াং ইন-বমের মাঝমাঠ। কোরিয়ার জয়ে সেই সমন্বয়ের ছাপ স্পষ্ট দেখা গেছে।
ইরান: তারেমি-আজমুনদের অভিজ্ঞ আক্রমণভাগ নিয়ে টানা চতুর্থ বিশ্বকাপ। টানা বিশ্বকাপ খেললেও এখনো নকআউট পর্বে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারেনি ইরান। এবার সেই আক্ষেপ ঘোচানোর লক্ষ্য তাদের।
উজবেকিস্তান: অভিষেকেই নজর কাড়ার মতো রসদ আছে। ম্যানচেস্টার সিটির ডিফেন্ডার আবদুকোদির খুসানভ এই মুহূর্তে মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে দামি ফুটবলার।
জর্ডান: ২০২৩ এশিয়ান কাপের ফাইনালিস্ট। মুসা আল-তামারি তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। হারানোর কিছু নেই, এমন দল বিশ্বকাপে বরাবরই বিপজ্জনক।
সৌদি আরব ও কাতার: সালেম আল-দাওসারি ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার জালে গোল দিয়ে দেখিয়েছেন সৌদিরা কী পারে। আর কাতারের আকরাম আফিফ টানা দুই এশিয়ান কাপজয়ী দলের সেরা তারকা।
অস্ট্রেলিয়া ও ইরাক: সকারুদের শক্তি তাদের সংগঠিত রক্ষণ। আর ইরাকের আয়মান হুসেইন, যার গোলেই বলিভিয়া-বাধা পেরিয়েছে তারা। চল্লিশ বছরের অপেক্ষা ঘোচানো দলটির আবেগই তাদের বড় অস্ত্র।
ফিফার চোখে এশিয়া কেন সোনার খনি
উত্তরটা জনসংখ্যার অঙ্কে। ভারতে ১৪৪ কোটি, চীনে ১৪১ কোটি, ইন্দোনেশিয়ায় ২৮ কোটি, পাকিস্তানে ২৪ কোটি, বাংলাদেশে ১৭ কোটির বেশি এবং জাপানে সাড়ে ১২ কোটি মানুষের বাস। সব মিলিয়ে পৃথিবীর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ এই মহাদেশে। এর বিশাল অংশ ফুটবল দেখে, যদিও তাদের অনেক দেশই বিশ্বকাপে খেলে না।
কাতার বিশ্বকাপের টিভি দর্শকের বড় অংশই ছিল এশিয়ার। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, মার্চেন্ডাইজ, সবখানেই এশিয়া ফিফার সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা বাজার। তাই ৪৮ দলের বিশ্বকাপে এশিয়ার কোটা ৪.৫ থেকে ৮+১-এ উন্নীত হওয়ার পেছনে শুধু ফুটবলীয় যুক্তি নয়, শক্তিশালী বাণিজ্যিক হিসাবও কাজ করেছে।
এবং বাংলাদেশ: গ্যালারির দর্শক থেকে মাঠের স্বপ্ন
বিশ্বকাপের ঢেউ শুধু মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সারাবিশ্বের মতো তা ঢাকাসহ সারাদেশের ঘরে ঘরে, মাঠে-ময়দানেও পৌঁছে গেছে। তবে এবার সেই উন্মাদনা শুধু আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকা ওড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে কোটি বাঙালি।
হামজা চৌধুরী ও শামিত সোমদের অন্তর্ভুক্তির পর ট্রান্সফারমার্কেটের হিসাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান জাতীয় দলে পরিণত হয়েছে।

পরিবর্তনের প্রমাণ মিলছে মাঠের ফলাফলেও। গত নভেম্বরে ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে কানায় কানায় ভরা গ্যালারির সামনে শেখ মোরসালিনের গোলে ভারতকে ১-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ। ২২ বছরের মধ্যে ভারতের বিপক্ষে এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম জয়। এরপর এপ্রিলে মালদ্বীপে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে সেই ভারতকেই হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জেতে যুবারা।
আর জুনে এল সবচেয়ে বড় মাইলফলক। সান মারিনোকে তাদেরই মাঠে ২-১ গোলে হারিয়ে ইউরোপের মাটিতে প্রথম জয়ের ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। জোড়া গোল করেন তপু বর্মণ, আর নতুন কোচ টমাস ডুলির অভিষেক ম্যাচেই আসে এই অর্জন। ৮৬ মিনিটে হামজার ফ্রি-কিক থেকেই এসেছিল জয়সূচক গোল।
ম্যাচ শেষে ডুলি বলছিলেন, ‘হামজা আমাদের সেরা খেলোয়াড়। ও দলকে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ভালো করে তোলে।’ ইউরোপের নানা প্রান্ত থেকে প্রায় চার হাজার প্রবাসী সেদিন গ্যালারিতে ছিলেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে জর্ডানের অভিষেক, উজবেকিস্তানের প্রথম অংশগ্রহণ আর ইরাকের চার দশক পর ফেরা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। দরজাটা আগের চেয়ে অনেক বেশি খোলা। এশিয়ার কোটা এখন ৮+১, সামনে হয়তো আরও বাড়বে।
হামজা-মোরসালিনদের হাত ধরে যে জাগরণ শুরু হয়েছে, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের খেলাধুলার চর্চা-আগ্রহ জোরদার হয়েছে, এসবের সঙ্গে এই বিশ্বকাপের উন্মাদনা দেশের ফুটবল জাগরণের স্রোতকেই আরও বেগবান করবে।
আজ যে কিশোর টিভির সামনে বসে সন হিউং-মিন, মুসা আল-তামারি কিংবা তাকেফুসা কুবোর খেলা দেখছে, আগামীতে সে হয়তো নিজের নামটাই বিশ্বকাপের স্বপ্নের সঙ্গে কল্পনা করবে। জর্ডান পারলে, উজবেকিস্তান পারলে, বাংলাদেশ কেন নয়?





