বিশ্বকাপে ইরানের ভবিষ্যৎ, কী বলছে পরিস্থিতি কিংবা ফিফা | চ্যানেল আই অনলাইন

বিশ্বকাপে ইরানের ভবিষ্যৎ, কী বলছে পরিস্থিতি কিংবা ফিফা | চ্যানেল আই অনলাইন

ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলা চলছে। জেরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিটি মার্কিন ঘাটিতে তেহেরানের আক্রমণের খবরও আসছে। গালফ অঞ্চলে বিরাজ করছে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ইরানের বিশ্বকাপে খেলা নিয়েও। আসছে জুনে ফিফা বিশ্বকাপের তিন আয়োজক দেশের একটি যুক্তরাষ্ট্র এবং অংশগ্রহণ করার অপেক্ষায় থাকা দেশ ইরান যুদ্ধে জড়িয়েছে। এমন অবস্থায় মার্কিন মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে যাবে ইরান? প্রশ্ন বড় হচ্ছে, ইরান বয়কট করতে পারে কিনা আসর।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজন হলে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত এই বোমাবর্ষণ চলতে পারে। একাধিক শহরে হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন, এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় আয়োজিত হতে চলা বিশ্বকাপের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে বর্তমান পরিস্থিতির সামনে ছোট বিষয় মনে হতে পারে। তবে গত আটচল্লিশ ঘণ্টার ঘটনাবলি প্রশ্ন তুলেছে, ইরান আদৌ দল পাঠাবে কিনা, বা যুক্তরাষ্ট্র সরকার, যারা আগে থেকেই ইরানি নাগরিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে, তারা ইরানের অংশগ্রহণ সীমিত করবে কিনা। যদিও খেলাধুলার ক্ষেত্রে সীমিত ছাড় রেখেছে মার্কিন প্রশাসন।

শনিবার ওয়েলসের কার্ডিফে আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের বার্ষিক সাধারণ সভায় ফিফা মহাসচিব ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রম বলেছেন, ‘আমাদের একটি বৈঠক হয়েছে এবং বিস্তারিত মন্তব্য করা এখনই সম্ভব নয়। তবে আমরা বিশ্বজুড়ে সমস্ত বিষয়ের মতো এটিও পর্যবেক্ষণ করব।’

‘আমরা সর্বদা যেমন তিনটি স্বাগতিক দেশের সরকারের সাথে যোগাযোগ করছি, যেকোনো ক্ষেত্রেই তা অব্যাহত রাখব। সবাই নিরাপদ থাকবে।’

তবে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদী তাজ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এই হামলার পর আমরা আশা নিয়ে বিশ্বকাপের দিকে তাকাতে পারি না। অংশগ্রহণের বিষয়ে ক্রীড়া কর্মকর্তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন।’

সব ঠিক থাকলে ১১ জুন গড়াবে বিশ্বকাপ। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন থেকে ইরান বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে এবং ‘জি’ গ্রুপে বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড ও মিশরের সঙ্গে রয়েছে। তাদের তিনটি ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ার কথা, ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছে সোফাই স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে, ২১ জুন একই ভেন্যুতে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এবং ২৬ জুন সিয়াটলের লুমেন ফিল্ডে মিশরের বিপক্ষে।

বিশ্বকাপে ইরানের না খেলা নিয়ে সম্ভাব্য বেশকিছু কারণ আছে। ইরান কেন অংশ নাও নিতে পারে? প্রশ্ন আছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বাধা দিতে পারে?

সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিবাদে ইরান বিশ্বকাপ বর্জন করতে পারে। বর্তমানে ইরানে যে মার্কিন হামলা চলছে তার করণে নিরাপত্তাজনিত ইস্যু দাঁড় হতে পারে, এবং বিভিন্ন পক্ষ যেমন ফিফা মনে করতে পারে যে অংশগ্রহণ নিরাপদ নয় বা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়।

ইরানের পাল্টা হামলার জেরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার দেশটিকে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সাল থেকে বারবার দাবি করেছে, দল-সমর্থক, সকলকেই বিশ্বকাপে স্বাগত জানানো হবে। ২০১৮ সালে উত্তর আমেরিকাকে আয়োজক দেশ হিসেবে নির্বাচনের আগে ট্রাম্প এক চিঠিতে লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র পূর্বের অলিম্পিক ও বিশ্বকাপের মতোই উন্মুক্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করবে এবং সব দেশের যোগ্য খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সমর্থক বৈষম্যহীনভাবে প্রবেশ করতে পারবেন।

ইতিমধ্যে ইরানসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকের উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। তবে বিশ্বকাপ, অলিম্পিক বা বড় ক্রীড়া আসরে অংশ নিতে আসা খেলোয়াড়, কোচ ও প্রয়োজনীয় সহায়ক কর্মীদের জন্য সীমিত ছাড় রাখা হয়েছে। বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানের আগে একাধিক ইরানি প্রতিনিধির ভিসা নাকচ করা হয়েছিল।

হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্স প্রধান অ্যান্ড্রু গিউলিয়ানি বলেছিনেল, ‘প্রত্যেক ভিসা সিদ্ধান্তই জাতীয় নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত। যদি ফিফা এসব সিদ্ধান্ত বদলাতে না পারে, তবে পুরো দলকেও নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাদের কিছু নাও করার থাকতে পারে।’

ইরান সরে দাঁড়ালে কী হবে?
কোন দল অংশ নিতে না পারলে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী সংস্থাটি নিজ বিবেচনায় বিকল্প দল ডাকতে পারে বা প্রতিযোগিতার কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে।

২০২৬ বিশ্বকাপের বিধিমালার ৬.৫ ধারায় বলা হয়েছে, ফোর্স ম্যাজিউর পরিস্থিতির কারণে কোন দল সরে দাঁড়ালে বা ম্যাচ আয়োজন সম্ভব না হলে অনুমোদিত আয়োজক সংস্থা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। ৬.৭ ধারায় বলা হয়েছে, একই ফোর্স ম্যাজিউর পরিস্থিতিতে দল সরে গেলে বা বাদ পড়লে ফিফা নিজ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং চাইলে অন্যকোন দেশকে প্রতিস্থাপনের জন্য বেছে নিতে পারবে।

ইরান সরে দাঁড়ালে ফিফার দুটি পথ থাকবে
‘জি’ গ্রুপকে তিন দলের গ্রুপে রূপান্তর করা হবে, অর্থাৎ ৪৮ থেকে নেমে সেটি এসে দাঁড়াবে ৪৭ দেশের বিশ্বকাপে। সেক্ষেত্রে বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড ও মিশর একে অপরের বিপক্ষে খেলার পর গ্রুপের প্রথম ও দ্বিতীয় দল পরের রাউন্ডে যাবে।

আর একটি হতে পারে কোন দেশকে ইরানের জায়গায় নেয়া। তবে সময় স্বল্পতার কারণে বিকল্প দল খুঁজে পাওয়া জটিল হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে দ্রুত কোন স্পষ্টতা পাওয়া কঠিন। ফলে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ালে প্রস্তুতি, চুক্তি ও আনুষঙ্গিক আয়োজন নিয়ে ব্যাপক জটিলতা তৈরি হবে।

অন্যদেশ নেয়া হলে, কোন দেশ ইরানের জায়গা নিতে পারে?
এশিয়ার বাছাইপর্বের বহুস্তরীয় কাঠামোর কারণে যোগ্যতার ভিত্তিতে বিকল্প নির্বাচন কঠিন। ইরান তৃতীয় পর্বে নিজেদের গ্রুপ জি থেকে সরাসরি বিশ্বকাপে ওঠে। উজবেকিস্তানও সরাসরি জায়গা পায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার চতুর্থ পর্বে যায়, যেখানে কাতার শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে ওঠে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরাকের কাছে প্লে-অফে হারে। ইরাক এরপর আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে যায়, যেখানে তারা বলিভিয়া বা সুরিনামের মুখোমুখি হবে।

ইরাক জিতলে সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে। ইরাক হারলে ইরাক বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে যেকাউকে বেছে নেয়া হতে পারে। এমনকি এশিয়ার বাইরে থেকেও বিকল্প নেয়ার সুযোগ রয়েছে। ফিফা তাদের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এমন ঘটানা আগে ঘটেছে?
অতীতে এমন নজির থাকলেও আধুনিকযুগে বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের পর কোন দেশের সরে দাঁড়ানোর নজির নেই। সর্বশেষ ১৯৫০ সালে স্কটল্যান্ড ও তুরস্ক ড্রয়ের আগে সরে দাঁড়ায়। ড্রয়ের পর ভারত ও ফ্রান্স অংশ নেয়নি। ফলে ওই আসরে মাত্র ১৩টি দল অংশ নেয়।

আধুনিক সময়ের কাছাকাছি উদাহরণ হল, ২০২৫ সালের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ। গত মার্চে, আসর শুরুর তিনমাসেরও কম সময় আগে, বহু-মালিকানার নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে মেক্সিকোর ক্লাব লিওনকে ফিফা বাদ দেয়, এ নিয়ে আপিল প্রক্রিয়া মে মাসের শুরুর দিক পর্যন্ত গড়ায়।

Scroll to Top