যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে ইরানে যে ভয়াবহ যুদ্ধের সূচনা হয়েছে, সেই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অন্দরমহল থেকে শুরু করে বৈশ্বিক অর্থনীতির শিরা-উপশিরায় এক তীব্র কম্পন সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তাদের এই সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল, নৌবাহিনী এবং পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে রুদ্ধদ্বার ব্রিফিং শোনার পর মার্কিন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা থেকে একটি ভয়ংকর সত্য বেরিয়ে আসে: এই যুদ্ধের কোনো সুস্পষ্ট সমাপ্তিরেখা বা ‘এন্ডগেম’ নেই। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, ওয়াশিংটন কেন এই যুদ্ধে জড়াল, এর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী এবং কতদিন এই রক্তপাত চলবে, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা হোয়াইট হাউস দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
গত ১০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি-তে অবস্থিত ইউ.এস. ক্যাপিটল ভবনে (ক্যাপিটল হিল) একটি রুদ্ধদ্বার ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। এই ব্রিফিংয়ে মার্কিন সিনেটরদেরকে ইরানের সাথে চলমান সংঘাত (অপারেশন এপিক ফিউরি), এর সম্ভাব্য ব্যয়, কৌশল এবং মার্কিন স্থল সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রশাসনের শীর্ষ প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ধারণা দেন।

সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির এই দুই ঘণ্টার গোপন ব্রিফিং থেকে বেরিয়ে এসে কানেটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল তার ১৫ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, প্রশাসনের রণকৌশল নিয়ে তার কাছে উত্তরের চেয়ে প্রশ্নের সংখ্যাই বেশি। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য চরম পরস্পরবিরোধী; একদিকে তিনি বলছেন যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে, আবার পরক্ষণেই বলছেন সবেমাত্র শুরু হয়েছে।
আরেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মার্ফি এই যুদ্ধকৌশলকে সম্পূর্ণ ‘অসংগত’ বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন যে, সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা প্রশাসনের নেই। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট যদি কংগ্রেসের কাছে এই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন চাইতেন, তবে তিনি তা পেতেন না, কারণ আমেরিকার সাধারণ জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার দাবি জানাত।
এটি কেবল রাজনৈতিক বাগবিতণ্ডা নয়, বরং মার্কিন সংবিধান এবং ১৯৭০-এর দশকে প্রণীত ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশনের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন হ্যামলাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড শ্যুলটজের মতো আইন বিশেষজ্ঞরা। ট্রাম্প প্রশাসন ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলাকে ‘আসন্ন হুমকি’র প্রতিক্রিয়া হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, খোদ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যুদ্ধের আগে জানিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র বা মিত্রদের ওপর ইরানের দিক থেকে কোনো আসন্ন হুমকির প্রমাণ তাদের কাছে নেই। শ্যুলটজের মতে, আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের হামলা মার্কিন অভ্যন্তরীণ আইনে সম্পূর্ণ বেআইনি হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এই অস্পষ্ট রণকৌশলের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো ইরানে মার্কিন পদাতিক সেনা মোতায়েনের প্রচ্ছন্ন সম্ভাবনা। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট গত সপ্তাহে যদিও বলেছিলেন যে আপাতত স্থল অভিযান পরিকল্পনার অংশ নয়, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব বিকল্পই খোলা রাখছেন। যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্য এই শঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করেছে। রুবিও কংগ্রেসনাল ব্রিফিংয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের পারমাণবিক উপাদান সুরক্ষিত করতে হলে সেখানে “কাউকে না কাউকে গিয়ে তা নিয়ে আসতে হবে”।
এই সংঘাতের মানবিক ও আর্থিক মূল্য ইতোমধ্যে অকল্পনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে। ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে প্রশ্ন তুলেছেন যে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ মিলিয়ন মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মতো অর্থ নেই, তখন ইরানে বোমা ফেলার জন্য প্রতিদিন এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে। সংঘাতের ভয়াবহতার চিত্র আরও মর্মান্তিক রূপ নেয় যখন আমরা দেখি যে, দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলায় প্রায় ১৭০ জন নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। এই চরম অমানবিক ঘটনার তদন্ত দাবি করেছেন ছয়জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর।
অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রায় সর্বসম্মতভাবে প্রেসিডেন্টের এই সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন জানালেও, দলের ভেতরেও অসন্তোষ দানা বাঁধছে। প্রতিনিধি সভার পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান ব্রায়ান মাস্ট প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করলেও, সাউথ ক্যারোলিনার প্রতিনিধি ন্যান্সি মেস তার রাজ্যের তরুণদের এই যুদ্ধে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং সিনেটর র্যান্ড পল স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, যুদ্ধ হওয়া উচিত সর্বশেষ বিকল্প, প্রথম পদক্ষেপ নয়।
কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, প্রস্থান কৌশল বা ‘এন্ডগেম’ ছাড়া শুরু হওয়া এই যুদ্ধ একটি অনিবার্য বৈশ্বিক বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে। মার্কিন কংগ্রেস যদি তার অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা ব্যবহার করে এই বেপরোয়া সামরিক অভিযান নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ না নেয়, তবে বিশ্বকে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে হাজারো মানুষের রক্তপাতই নয়, বরং এক অপূরণীয় অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের সাক্ষী হতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, এর লাগাম টেনে ধরা তার চেয়ে বহুগুণ কঠিন।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






