
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর ভবিষ্যতের কোনো প্রযুক্তি নয়,বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। লেখালেখি, ছবি তৈরি, তথ্য খোঁজা, অনুবাদ, গবেষণা থেকে শুরু করে অফিসের নানা কাজ প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআই মানুষের সময় ও শ্রম কমিয়ে আনছে। প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে সম্ভাবনাময়।
তবে এর ব্যবহার যখন প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখনই সামনে আসে নতুন এক প্রশ্ন এআই কি আমাদের কাজ সহজ করছে, নাকি ধীরে ধীরে আমাদের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার বিকল্প হয়ে উঠছে?
কাজের সহায়ক থেকে নির্ভরতার জায়গায়
একসময় কোনো তথ্য জানতে বই, সংবাদপত্র কিংবা বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হতো। এখন কয়েকটি শব্দ লিখলেই এআই মুহূর্তের মধ্যে উত্তর দিতে পারে। একটি ই-মেইল লিখতে, কোনো বিষয়ে আইডিয়া পেতে কিংবা দীর্ঘ লেখা সংক্ষেপ করতেও এআই বেশ কার্যকর।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন মানুষ নিজের চিন্তা করার আগেই এআইয়ের কাছে উত্তর খুঁজতে শুরু করে। একটি সাধারণ মেসেজ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত মতামত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা সৃজনশীল কাজ—সবকিছুতেই যদি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়, তাহলে ব্যক্তির নিজস্ব দক্ষতার চর্চা কমে যেতে পারে।
সহজ হচ্ছে কাজ, কমছে কি দক্ষতা?
প্রযুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো মানুষের কাজ সহজ করা। কিন্তু প্রতিটি কাজ সহজ করে ফেললে দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনও অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়।
একজন শিক্ষার্থী যদি কোনো বিষয় বুঝে নিজের ভাষায় লেখার বদলে সরাসরি এআই দিয়ে উত্তর তৈরি করে, তাহলে হয়তো কাজটি দ্রুত শেষ হবে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় তার বিশ্লেষণ, গবেষণা ও লেখার দক্ষতা কতটা তৈরি হচ্ছে সেটিও ভাবার বিষয়।
একইভাবে, একজন কনটেন্ট নির্মাতা যদি প্রতিটি বিষয়, শিরোনাম কিংবা সৃজনশীল ধারণার জন্য এআইয়ের ওপর নির্ভর করেন, তাহলে সময় বাঁচলেও নিজের সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অনুভূতিও কি এখন এআই লিখবে?
এআইয়ের ব্যবহার এখন শুধু পেশাগত কাজেই সীমাবদ্ধ নেই। জন্মদিনের শুভেচ্ছা, ভালোবাসার বার্তা, ক্ষমা চাওয়া কিংবা কারও প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মতো ব্যক্তিগত বিষয়েও অনেকে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন।
এতে ভাষা হয়তো সুন্দর হচ্ছে, কিন্তু অনুভূতিটা কতটা নিজের থাকছে?
মানুষের লেখা অসম্পূর্ণ হতে পারে, ব্যাকরণে ভুল থাকতে পারে, শব্দচয়ন খুব সাধারণ হতে পারে। কিন্তু সেই লেখার মধ্যে ব্যক্তিগত অনুভূতি থাকে। প্রযুক্তি সেই অনুভূতিকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে দিতে পারে, কিন্তু অনুভূতিটা তৈরি করতে পারে না।
এআইকে ভয় নয়, ব্যবহার জানতে হবে
এআই নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি শিক্ষার্থী, গবেষক, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, কনটেন্ট ক্রিয়েটরসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের জন্য শক্তিশালী সহায়ক হতে পারে।
কোনো বিষয় বোঝার জন্য এআইয়ের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তথ্য যাচাই করা জরুরি। লেখার কাঠামো তৈরি করতে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত বক্তব্যে নিজের চিন্তা থাকা দরকার। সময় বাঁচাতে প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাছেই রাখা উচিত।
প্রযুক্তি থাকবে হাতে, নিয়ন্ত্রণও থাকতে হবে হাতে
এআই যত উন্নত হবে, এর ব্যবহারও তত বাড়বে। ভবিষ্যতে এমন অনেক কাজ হয়তো এআই করবে, যেগুলো এখন মানুষ নিজেই করছে। তাই এআই থেকে দূরে থাকার চেয়ে বরং এর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সেই মানিয়ে নেওয়ার অর্থ নিজের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও বিচারবোধ প্রযুক্তির হাতে তুলে দেওয়া নয়।
এআই আমাদের কাজের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু চিন্তার জায়গা দখল করা উচিত নয়।
প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নিজের দক্ষতার বিকল্প হিসেবে নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা এআই কতটা বুদ্ধিমান, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো এআই ব্যবহারের পরও আমরা নিজেরা কতটা চিন্তা করতে পারছি? কারণ, এআই থাকুক আমাদের হাতে, আমাদের মাথার জায়গায় নয়।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
প্রতিবেদক
ফারজিয়া হোসেন
নির্বাহী বিক্রয় ও বিপণন চ্যানেল আই
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…