
ঢাকা, ২০ জুন –প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন নাটকীয়তা ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে আগামীকাল রোববার (২১ জুন) মালয়েশিয়া ও চীনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়ছেন তিনি। তবে তার ঢাকা ত্যাগের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, শনিবার (২০ জুন) সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আকস্মিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হাজির হন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।
সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে তার এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়ে ইতিমধ্যেই দেশের কূটনৈতিক মহলে নানামুখী গুঞ্জন ও কৌতুহল শুরু হয়েছে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এই বৈঠককে একদম ‘রুটিন দ্বিপক্ষীয় আলোচনা’ হিসেবে বর্ণনা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
“যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাজি ধরলে পস্তাতে হবে না”— মার্কিন রাষ্ট্রদূতের রহস্যময় বার্তা!
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন অবশ্য রাজনৈতিক আলোচনার চেয়ে ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়েই বেশি কথা বলেন। তবে তার সেই ফুটবলীয় বার্তার আড়ালে এক গভীর কূটনৈতিক ইঙ্গিত দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
ক্রিস্টেনসেন অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন, “একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণে আমি আজ এখানে এসেছি। গত রাতে ২০২৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দারুণ একটা জয় পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং পরবর্তী পর্বে চলে গেছে। সুতরাং আমি এখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সব বাংলাদেশিকে উৎসাহিত করতে এসেছি, যাতে সামনের দিনে বিশ্বকাপে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করেন। কেননা, একটা কথা মনে রাখবেন— দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাজি ধরলে আপনাকে কখনো পস্তাতে হবে না।”
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের ঠিক আগের দিন মার্কিন দূতের মুখে “যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাজি ধরলে পস্তাতে হবে না”— এই বাক্যটিকে স্রেফ ফুটবলীয় মন্তব্য হিসেবে মানতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। বেইজিংয়ের দিকে ঢাকার ঝুঁকে পড়ার আগে এটি ওয়াশিংটনের এক চতুর মনস্তাত্ত্বিক বার্তা বলেই মনে করছেন অনেকে।
রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রীর এই ছয় দিনের সফরটি বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির জন্য অ্যাসিড টেস্ট হতে চলেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চীন সফরের প্রথম দুইদিন (২৩ ও ২৪ জুন) দালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF)’-এর সামিটে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পাশাপাশি সেখানে বিশ্বনেতাদের সাথে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তিনি।
এরপরই শুরু হবে এই সফরের আসল আকর্ষণ— বেইজিং পর্ব:
২৫ জুন বিকাল: চীনের বিখ্যাত ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনা প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
২৬ জুন: চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে হবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সেই বহুপ্রতিক্ষিত শীর্ষ বৈঠক।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সফরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা, কৃষি, বাণিজ্য, বিপুল বিনিয়োগ, নতুন উন্নয়ন সহযোগিতা, মিডিয়া কোঅপারেশন এবং গ্রিন এনার্জি খাতে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং দুটি চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
একদিকে বেইজিংয়ে বিশাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চুক্তির মহাযজ্ঞ, অন্যদিকে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এমন মোক্ষম সময়ে বিশেষ উপস্থিতি ও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য— সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের লাতিন বিশ্বমঞ্চের ফুটবল উত্তেজনার মাঝেও বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি এখন ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটছে!
এনএন/ ২০ জুন ২০২৬






