রাজধানীর মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকার দীর্ঘদিনের আতঙ্ক মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান। একসময় বস্তির কিশোর, পরে পাতি মাস্তান সেখান থেকে ধাপে ধাপে রাজধানীর অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হন তিনি। হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র, জমি দখল, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ এমন নানা অভিযোগে তার বিরুদ্ধে রয়েছে ৩২টি মামলা।
সর্বশেষ আদাবরের নবোদয় হাউজিং ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার বাদশা হত্যা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাতে তাকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
র্যাবের দাবি, বাদশা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার অন্য আসামিদের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, মূল হামলাকারী পারভেজকে হত্যার অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন লেদু। এই তথ্যের ভিত্তিতেই মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদিয়া হাউজিং সোসাইটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
দারিদ্র্য থেকে অপরাধ জগতে
লক্ষ্মীপুরের ভবানীগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে পরিবারসহ ঢাকায় আসেন মনোয়ার হাসান জীবন। জন্ম ১৯৭৮ সালের ১৫ জুন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মোহাম্মদপুরের জহুরী মহল্লা বস্তিতে বেড়ে ওঠা লেদুর পরিবার ছিল চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। বাবা ও বড় ভাই রিকশা চালাতেন, আর মা ও বোন ফুটপাতে চা-পান বিক্রি করতেন। পঞ্চম শ্রেণির বেশি পড়াশোনা হয়নি তার। কিশোর বয়সেই দিনমজুরির ভিত্তিতে মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হন। পরে নিজেই গড়ে তোলেন মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় পাতি মাস্তান হিসেবে পরিচিতি পেলেও অল্প সময়েই ভয়ংকর সন্ত্রাসীতে রূপ নেন।
রাজনীতির ছত্রছায়া
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন লেদু। পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দিয়ে আদাবর থানা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি তাকে বহিষ্কার করলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।
আলোচিত হত্যাকাণ্ডে বারবার নাম
২০০১ সালের পর থেকেই ভাড়াটে খুনি হিসেবে লেদুর নাম আলোচনায় আসে বলে জানায় পুলিশ। তার বিরুদ্ধে যেসব আলোচিত হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—২০০৩ সালে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এস আর পলাশ হত্যা। ২০১০ সালে ওহিদুজ্জামান হত্যা। ২০১৭ সালে ছাত্রলীগ নেতা মশিউর রহমান মশু হত্যা। ২০২৬ সালে বিএনপি নেতা আবুল বাশার বাদশা হত্যা। ওহিদুজ্জামান হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ২০১২ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন লেদু। মুক্তির পর আবারও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেন।
অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য
র্যাব ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর, আদাবর, বসিলা, রায়েরবাজারসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় লেদুর নিয়ন্ত্রণ ছিল। চাঁদ উদ্যান, সাত মসজিদ হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, তুরাগ হাউজিং, বসিলা, কাটাসুর, মোহাম্মদিয়া হাউজিং, নবোদয় হাউজিংসহ একাধিক এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শনিরবিল, শেখেরটেক, জেনেভা ক্যাম্প ও জহুরী মহল্লায় ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজার ১০৮টি মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। ২০২১ সালে দারুস সালাম এলাকা থেকে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলিসহ গ্রেপ্তার হন লেদু। সেই অস্ত্র মামলায় তার ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।
কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক
পুলিশের দাবি, আদাবর-মোহাম্মদপুরের কয়েকটি কিশোর গ্যাংয়ের অন্যতম মদদদাতা ছিলেন লেদু। জনি, রনি ও ‘কবজি কাটা’ আনোয়ারসহ কয়েকজন কিশোর গ্যাং নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মুক্তিপণ আদায়, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসায় এসব গ্যাংকে ব্যবহার করা হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
জুলাই অভ্যুত্থানের পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব.) মঞ্জুরুল কাদেরের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা এবং ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগেও আলোচনায় আসেন লেদু। এ ছাড়া ২০২৫ সালে শেখেরটেকে একটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে কেয়ারটেকারকে মারধর এবং চন্দ্রিমা মডেল টাউনে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে পৃথক মামলাও হয়।
র্যাব যা বলছে
র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বলেন, লেদু হাসানের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মোট ৩২টি মামলা রয়েছে। মোহাম্মদপুর থানায় তার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ১০টি, বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি, দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা এবং একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। আদাবর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটটি, বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ছয়টি, হত্যা ও হত্যাচেষ্টার দুটি এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা রয়েছে। এছাড়া দারুস সালাম থানায় তার বিরুদ্ধে একটি অস্ত্র মামলাও রয়েছে।
তিনি বলেন, মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে লেদুর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং কিশোর গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন। গ্রেপ্তার লেদুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিএনপি নেতা আবুল বাশার বাদশা হত্যা মামলার পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।


