পদ্মা ব্যারাজ কী, এটি কোথায় নির্মাণ করা হবে? | চ্যানেল আই অনলাইন

পদ্মা ব্যারাজ কী, এটি কোথায় নির্মাণ করা হবে? | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলাদেশে পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার একটি বৃহৎ ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ নামের এই প্রকল্পটি নিজস্ব অর্থায়নে আগামী সাত বছরে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের লক্ষ্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, কৃষি সেচ সম্প্রসারণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।

বুধবার ঢাকায় সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে বলা হয়, পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত পাঁচটি মৃতপ্রায় নদী পুনর্জীবিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রায় ২৪টি জেলার পানিসংকট নিরসন হবে এবং প্রায় সাত কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ব্যারাজ কেন্দ্র করে তিনটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সাতটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ব্যারাজ কী

ব্যারাজ হলো নদী বা জলাধারের ওপর নির্মিত একটি নিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো, যার মাধ্যমে পানির প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না করে তার গতি ও দিক নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এতে একাধিক দরজা (গেট) থাকে, যেগুলো খুলে বা বন্ধ করে পানি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ড্যাম বা বাঁধের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো; বাঁধে পানি আটকানো হয়, কিন্তু ব্যারাজে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন খাল বা নদীতে সরবরাহ করা হয়। সাধারণত কৃষি সেচ, নদী পুনরুদ্ধার এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজ ব্যবহার করা হয়।

প্রকল্পের অবস্থান ও কাঠামো

প্রকল্প অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দুটি ফিশ পাস থাকবে। নদীর অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন এবং পলি ব্যবস্থাপনার জন্য এসব কাঠামো ব্যবহার করা হবে। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংরক্ষিত পানি তিনটি অফটেক অবকাঠামোর মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হবে।

নদী পুনরুদ্ধার ও সেচ ব্যবস্থা

প্রথম ধাপে গড়াই-মধুমতি ও হিসনা নদীসহ কয়েকটি নদীর প্রায় শত শত কিলোমিটার অংশ খনন ও পুনঃখনন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৮০০ কিউসেক পানি বিভিন্ন নদীতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, ফরিদপুর, চুয়াডাঙ্গাসহ অন্তত ১৯টি জেলার প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে।

সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব

সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশে বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন অতিরিক্ত ধান এবং আড়াই লাখ টন মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা কমে পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরবে এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। এছাড়া গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প, উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে পানির সরবরাহ সহজ হবে বলে জানানো হয়েছে।

এই প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার আর্থ-সামাজিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। তবে ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিবেশগত প্রভাব এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় এটি প্রত্যাশিত ফল না দিয়ে পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

Scroll to Top