চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ডা. তিমির বরণ চৌধুরীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর একটি মামলায় নির্ধারিত সময়ে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অপর মামলায় ৩ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৩ টাকা ৭৭ পয়সার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ভোগদখলে রাখার অভিযোগ করা হয়েছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১-এ মামলা দুটি করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কার্যালয়টির উপপরিচালক মো. আল আমিন।
দুদকের নথি অনুযায়ী, প্রথম মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারায় করা হয়েছে। এতে অভিযোগ করা হয়, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের একপর্যায়ে তিমির বরণ চৌধুরীর কাছে সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য ফরম ইস্যু করা হয়। গত ২৯ মার্চ দুদকের কর্মকর্তারা চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জের ৬ নম্বর মোমিন রোডের বাসায় গিয়ে তাঁর হাতে ফরমটি দেন। তিনি নিজ স্বাক্ষরে সেটি গ্রহণ করেন।
দুদকের দাবি, সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য নির্ধারিত ২১ কার্যদিবসের সময় ২৯ এপ্রিল শেষ হলেও তিনি বিবরণী জমা দেননি। এমনকি সময় বাড়ানোর আবেদনও করেননি। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় করা হয়েছে। এতে তিমির বরণ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৩ টাকা ৭৭ পয়সার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান নথিতে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে তিমির বরণ চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আসে। পরে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানে তাঁর সম্পদ ও গ্রহণযোগ্য আয়ের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
দুদকের হিসাব অনুযায়ী, রহমতগঞ্জ মৌজায় একটি ১০ তলা আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে তিমির বরণ চৌধুরীর বিনিয়োগ ৪ কোটি ৩১ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৯ টাকা ৭৭ পয়সা। ভবনটির নির্মাণকাজ এখনো চলমান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৮ লাখ ৪৭ হাজার ৩০২ টাকার অস্থাবর সম্পদ এবং তাঁর মেয়ের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষাব্যয়সহ ৫৩ লাখ ৩ হাজার ৪২২ টাকা পারিবারিক ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে বলে এজাহারে দাবি করা হয়। সব মিলিয়ে তাঁর সম্পদ ও পারিবারিক ব্যয়ের পরিমাণ ৫ কোটি ২ লাখ ৯৩ হাজার ৩৮৩ টাকা ৭৭ পয়সা।
অন্যদিকে অতীত সঞ্চয়, পরিচালক ভাতা, ঠিকাদারি ব্যবসা, গৃহসম্পত্তির ভাড়া, জনপ্রতিনিধি হিসেবে সম্মানী, কৃষি আয় ও ঋণসহ মোট ১ কোটি ৯৪ লাখ ৪২ হাজার ৭৯০ টাকা গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস হিসেবে পেয়েছে দুদক।
দুদকের হিসাবে, মোট সম্পদ ও পারিবারিক ব্যয় থেকে গ্রহণযোগ্য আয় বাদ দিলে ৩ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৩ টাকা ৭৭ পয়সা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ হিসেবে পাওয়া যায়।
দুদকের এজাহারে রহমতগঞ্জের ১০ তলা ভবনটির বিনিয়োগের হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, তিমির বরণ চৌধুরী ও তাঁর দুই ভাই পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমির ওপর এক আত্মীয়ের অংশীদারিত্বসহ যৌথভাবে ভবনটি নির্মাণ করছেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আত্মীয়ের মালিকানাধীন অংশের ভবন নির্মাণ ব্যয়ের একটি অংশও তিমির বরণ চৌধুরী বিনিয়োগ করেন। ফলে ভবনটির মোট বিনিয়োগের ৫৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ তাঁর বিনিয়োগের আওতায় পড়ে।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, আয়কর রিটার্নে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত তিনি এ খাতে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৩০ হাজার ৫৬১ টাকা বিনিয়োগ ব্যয় দেখিয়েছেন। তবে প্রকৌশলীর পরিমাপ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকৃত বিনিয়োগ ৪ কোটি ৩১ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৯ টাকা ৭৭ পয়সা বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, মামলার তদন্তকালে অন্য কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা আমলে নেওয়া হবে।
দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১-এর উপপরিচালক মো. আল আমিন বলেন, “ডা. তিমির বরণ চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়েছে। একটি সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার অভিযোগে এবং অপরটি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে।”
দুদকের নথি অনুযায়ী, তিমির বরণ চৌধুরী ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত পটিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য জানতে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


