দুয়ারে কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর মাত্র দুই দিন পর সারাদেশে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। নির্বাচনে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন, তাদের আবাসন নিশ্চিত করতে আগেভাগেই প্রস্তুতি শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সংসদ সদস্য ভবন (ন্যাম), সংসদ সদস্য হোস্টেল কমপ্লেক্স এবং নাখালপাড়ার এমপি ফ্ল্যাটগুলো সংস্কার ও মেরামতের কাজ চলছে পুরোদমে।
সময়মতো আবাসন প্রস্তুত করতে চলছে সিভিল সংস্কার, কারিগরি মেরামত ও বিশেষ ‘হাইজিন ড্রাইভ’। জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও গণপূর্ত বিভাগ যৌথভাবে এই কাজ তদারকি করছে।
ন্যাম ভবন ও নাখালপাড়ায় সংস্কারের মহাযজ্ঞ
রং–তুলি–মেরামতে ব্যস্ত ন্যাম ভবন, অপেক্ষায় নতুন সংসদ
মন্ত্রীপাড়ায় এখনো নীরবতা
মাঘের শীতের রোদে ন্যাম ভবনের দেয়ালে নতুন রঙের প্রলেপ পড়ছে। কোথাও হাতুড়ির ঠুকঠাক শব্দ, কোথাও পুরোনো আসবাব ঘষে-মেজে নতুন করে তোলা হচ্ছে। একদিকে দেশজুড়ে ভোটের আমেজ, অন্যদিকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ আবাসন প্রস্তুতের ব্যস্ততা।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ছয়টি ন্যাম ভবনের ২১৬টি ফ্ল্যাটে চলছে সংস্কারের বড় আয়োজন। লক্ষ্য- দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই সংসদ সদস্যরা যেন পরিচ্ছন্ন ও কর্মোপযোগী পরিবেশে থাকতে পারেন।
ভোটের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সংসদ গঠন ও শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হয়। সে কারণে আবাসন বরাদ্দ দ্রুত কার্যকর করা জরুরি। ধারণা করা হচ্ছে, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট শেষ হলে ১৬ থেকে ১৮ তারিখের মধ্যেই নতুন সরকার গঠন হতে পারে। এরপর নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে সংসদের শপথ কক্ষে।
সংসদ সদস্যদের সরকারি বাসা বরাদ্দ দেয় জাতীয় সংসদ সচিবালয়। নির্বাচন শেষে গেজেট প্রকাশ ও শপথ গ্রহণের পর এমপিরা সরকারি বাসার জন্য আবেদন করেন। আবেদনে সংসদীয় আসন, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, স্থায়ী ঠিকানা ও নিরাপত্তা–সংক্রান্ত তথ্য দিতে হয়।
যাচাই-বাছাই শেষে ফ্ল্যাটের প্রাপ্যতা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়। কেউ কেউ শুরুতে সংসদ হোস্টেলে থাকেন, পরে ন্যাম ভবনে স্থানান্তরিত হন। বরাদ্দ চূড়ান্ত হলে সংসদ সচিবালয় আদেশ জারি করে এবং গণপূর্ত বিভাগ ফ্ল্যাট হস্তান্তর করে।
ন্যাম ভবনের পাশাপাশি এমপি হোস্টেল, লাউঞ্জ, ডাইনিং ব্লক ও অস্থায়ী কার্যালয়েও চলছে পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার। কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ নয়, সংসদীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার প্রস্তুতি।

দীর্ঘদিন ফাঁকা থাকায় ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটগুলোতে জমে ছিল ধুলো ও ক্ষয়চিহ্ন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে এসব ফ্ল্যাট ব্যবহার হয়নি। এখন সেগুলোতে চলছে ব্যাপক সংস্কার ও ‘ডিপ ক্লিনিং’।
বাথরুম, স্যানিটারি লাইন, পানির সংযোগ ও বৈদ্যুতিক ফিটিং নতুন করে ঠিক করা হচ্ছে। ফ্যান, লাইট, সুইচ ও তার পরীক্ষা করা হচ্ছে নিবিড়ভাবে।
প্রকৌশল বিভাগ জানায়, যেকোনো ত্রুটি দ্রুত মেরামত করা হচ্ছে। দেয়ালে নতুন রঙ, দরজা-জানালার ফিটিং ও আসবাব সংস্কার একসঙ্গে চলছে। শতভাগ বসবাসযোগ্য না হলে কোনো ইউনিট হস্তান্তর করা হবে না।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের শের-ই-বাংলা নগর বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজ বলেন, নতুন এমপিদের আবাসনে পরিচ্ছন্নতা ও রঙের কাজকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সিভিল, স্যানিটারি ও বৈদ্যুতিক ফিটিং প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এসব কাজে সাড়ে ২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ইউনিটে বসানো হচ্ছে সিসিটিভি, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, গিজার, পানির পাম্প ও এসি। পাশাপাশি আধুনিক কেবলিং ও সাবস্টেশন মেরামতের কাজ চলছে।
লিফট ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১২টি লিফটে ব্যাটারি ব্যাকআপ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে, যাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে লিফট আটকে না পড়ে।
ঢাকায় নিজস্ব বাসা নেই- এমন এমপিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে ঢাকায় বাসা থাকা এমপিরাও ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট পান। নাখালপাড়ার ৪৯টি ফ্ল্যাটেও চলছে শেষ মুহূর্তের সংস্কার।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সত্তার বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সদস্যদের জন্য আমার ডিভিশনের আওতাধীন এমপিদের থাকার ফ্ল্যাটগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রং করা, ফিটিং ঠিক করা, পানির লাইন সংস্কারসহ প্রয়োজনীয় সব মেরামতের কাজ চলছে। সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে এসব কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।’

তবে কিছু কাঠামোগত সংস্কার চলমান থাকায় সব ইউনিট পুরোপুরি প্রস্তুত হতে দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে। এই সময় নবনির্বাচিত এমপিরা অস্থায়ীভাবে সংসদ হোস্টেলে থাকবেন।
এদিকে বেইলি রোড, মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডের মন্ত্রীপাড়ার বাসভবনগুলোতে এখনো সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। নির্বাচন শেষে এসব ভবনে কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে গণপূর্ত বিভাগ।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ নথি তৈরি করা হয়েছে। অগ্রাধিকারভিত্তিতে মেরামত ও প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। ভালো অংশগুলো অপরিবর্তিত রাখা হবে। আগামী সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ ও বসবাস করতে পারেন, সেই প্রস্তুতিই নেওয়া হচ্ছে।’
ভোটের মাঠে যখন ব্যালটের লড়াই, তখন ন্যাম ভবনের ভেতরে চলছে নতুন জনপ্রতিনিধিদের বরণের প্রস্তুতি। ধুলো উড়িয়ে, রঙ মেখে এক নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষায় রাজধানীর সংসদীয় আবাসন।



